রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে নেপালের সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের উল্লেখও এসেছে। এর পেছনে রয়েছে দুই প্রতিবেশী দেশের অভ্যুত্থানের সাদৃশ্য। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে উভয় দেশেই জেন-জি প্রজন্মের (১৯৯৭-২০১২ সালের জন্মগ্রহণকারীদের) নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থান ক্ষমতায় বড় পরিবর্তন এনেছে। এরপর এক মাসের মধ্যেই দুই দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
নেপালে নির্বাচনের দুই দিন পর গত শনিবার ফলাফল স্পষ্ট হলে রয়টার্স লিখেছে, বালেন্দ্র শাহর নেতৃত্বাধীন দলের অভাবনীয় সাফল্য বাংলাদেশের গত মাসের নির্বাচনের ঠিক উল্টো। সেখানেও ২০২৪ সালে জেন-জি অভ্যুত্থানের ফলে দেশের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি শাসকের পতন ঘটে।
নেপালে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) এককভাবে নির্বাচনে লড়ে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে। এতে তারা পার্লামেন্টে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পথে। হিমালয়ের দেশ নেপালে অভ্যুত্থান ঘটে বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের এক বছর পর, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে। এতে প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি পদত্যাগে বাধ্য হন। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তত্ত্বাবধানে গত বৃহস্পতিবার সাধারণ নির্বাচন হয়।
অভ্যুত্থানকারীদের কাছে জনপ্রিয় বালেন্দ্র শাহ, যিনি র্যাপার থেকে রাজনীতিবিদ হয়ে ২০২২ সালে কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচিত হন, এখন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে। ৩৬ বছর বয়সী শাহ অভ্যুত্থানের পর আরএসপিতে যোগ দেন। এই দলটি ২০২২ সালে গঠন করেন রবি লামিছানে, যিনি টিভি উপস্থাপক থেকে রাজনীতিতে এসে দুর্নীতি ও স্বজনপোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করেন।
প্রার্থী হিসেবে শাহ কাঠমান্ডুর এক আসনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলিকে বিপুল ভোটে হারান। ‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’ অনুসারে, নেপালের ২৭৫ আসনের পার্লামেন্টে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ১৬৫ আসনের মধ্যে আরএসপি ১২৫টি জয় করে। ক্ষমতাচ্যুত কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিএন-ইউএমএল) ৮টি, নেপালি কংগ্রেস ১৮টি এবং নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি (এনসিপি) ৭টি আসন পায়। বাকি ১১০ আসন ভোটের অনুপাতে বণ্টিত হবে, যেখানেও আরএসপি এগিয়ে।
২০২২ সালে গঠিত আরএসপি ওই বছরের নির্বাচনে ৭টি সরাসরি আসন এবং অনুপাতে ১৩টি পায়। পরে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে জোট করে সরকারে যোগ দেয়, লামিছানে উপপ্রধানমন্ত্রী হন। এবার জেন-জি অভ্যুত্থানের দলটি এককভাবে লড়ে অভাবনীয় জয় নিয়ে সরকার গঠনের দিকে।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের নেতা তরুণেরা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠন করেন। এককভাবে লড়ার ঘোষণা সত্ত্বেও তারা জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করে। ৩০০ আসনের মধ্যে ৩০টি পেয়ে তারা ৬টি জয় করে।
আরএসপির মতো এনসিপিও রাজনৈতিক সংস্কার চেয়ে মাঠে নামে। নেপালে ৩ কোটি জনসংখ্যায় ১০ লাখ নতুন ভোটার ছিল, বাংলাদেশে ১৭ কোটিতে অর্ধকোটি। আরএসপি সংগঠিতভাবে লড়লেও এনসিপি প্রথাগত দলগুলোকে ছাড়াতে পারেনি।
এনসিপির ব্যর্থতার কারণ কী? নেপালের আরএসপির সাফল্য বাংলাদেশে আলোচনার বিষয়। সাংগঠনিক দুর্বলতা, দেশব্যাপী বিস্তারের অভাব, জোটবদ্ধতা এবং জামায়াতের সঙ্গে জোটে ভোটার হারানোর কথা উঠছে। কেউ মনে করেন, অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় যুক্ত হওয়ায় গ্রহণযোগ্যতা কমেছে; সংগঠন বিস্তারে মনোযোগ কম ছিল।
এনসিপির নেতারা বলছেন, অপপ্রচার সত্ত্বেও তারা জনসমর্থন পেয়েছে। মিত্ররা তাদের সুবিধা ভোগ করেছে। সামাজিক মাধ্যমে ইব্রাহিম আহমেদ লিখেছেন, এনসিপির ডানপন্থী রাজনীতি জনগণের দাবি মেটাতে পারেনি; নেপালে মধ্যপন্থী সেবামুখী রাজনীতি সফল। আব্বাস উদ্দিন উল্লেখ করেন, চাঁদাবাজি, দুর্নীতির অভিযোগ এবং আক্রমণাত্মক ভাষা এনসিপিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান বলেন, পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও এনসিপি তা প্রতিফলিত করতে পারেনি। নেপালে আরএসপি পরিবর্তনের এজেন্ট হয়ে উঠেছে। দুই দেশের অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট আলাদা; নেপালে দ্রুত নির্বাচন অভ্যুত্থানের প্রভাব রেখেছে। বালেন্দ্র শাহর অভিজ্ঞতা এবং নাগরিক সমাজের যোগদান আরএসপিকে শক্তিশালী করেছে।
এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, আরএসপি পুরোনো দল, সংসদে অভিজ্ঞতা আছে। বাংলাদেশে অভ্যুত্থানপন্থী দলগুলোই জয়ী; বিপক্ষীরা প্রত্যাখ্যাত। নেপালে বিপক্ষীরা কিছু আসন পেয়েছে। দলটির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ স্বীকার করেন, জোট না হলে এককভাবে ৩-৪ আসন পেতেন, কিন্তু পরিবেশ বাধ্য করেছে।