জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান মন্তব্য করেছেন যে, সংসদকে কার্যকরী করার প্রক্রিয়ায় সরকারি দল এবং বিরোধী দলের মধ্যে সমন্বয় অপরিহার্য। তিনি উপমা দিয়ে বলেন, সরকারি দল যদি যানবাহনের অগ্রবর্তী চাকা হয়, তাহলে বিরোধী দল হবে পশ্চাদ্বর্তী চাকা।
সংসদকে ভবিষ্যতে অগ্রগতির বাহনে রূপান্তরিত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে জামায়াতের আমির বলেন, ‘আমরা এই সদিচ্ছা বজায় রাখতে চাই এবং এই ধারণা লালন করতে চাই যে, কোনো যানবাহন কখনো একটি চাকায় চলতে পারে না, সর্বনিম্ন দুটি চাকা প্রয়োজন। সরকারি দল যদি অগ্রবর্তী চাকা হয়, তাহলে বিরোধী দল হবে পশ্চাদ্বর্তী চাকা। একটিকে বাদ দিয়ে যানবাহন কোনো অবস্থাতেই একা চলতে পারবে না। আমরা সেই পথচলায় সমন্বয় চাই এবং পারস্পরিক সম্মানের স্থান চাই।’
আজ শনিবার বিকেলে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরস্থ বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জামায়াতে ইসলামীর আয়োজিত ইফতার মাহফিলে সভাপতির ভাষণে শফিকুর রহমান এসব কথা বলেন।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা গতানুগতিক কোনো বিরোধী দল হিসেবে এই সংসদে কার্যকরী হতে চাই না। আমরা চাই এই সংসদ হোক অর্থবহ, জনগণের সমস্ত আকাঙ্ক্ষা ও প্রাপ্তির কেন্দ্রস্থল, সরকারি দল যেমন দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে, আমরাও বিরোধী দলের অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে চাই।’
বর্তমান সরকার এবং সংসদের প্রতি জনগণের বিপুল প্রত্যাশা রয়েছে উল্লেখ করে জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, অতীতে নির্বাচন যেমন আমি-ডামি ছিল, সরকারি ও বিরোধী দলও তেমনি আমি-ডামি ছিল। এই ধরনের কোনো বিরোধী দল কোনো দেশের জন্য সুসমাচার বয়ে আনতে পারে না।
শফিকুর রহমান আরও বলেন, সরকারের গৃহীত সকল যুক্তিসংগত পদক্ষেপে তাদের পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা থাকবে। কিন্তু তাদের বিবেচনায় যদি মনে হয় সরকার কোনো অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তাহলে প্রথমে দৃষ্টি আকর্ষণ করে পরামর্শ প্রদান করা হবে। এসব পরামর্শ গ্রহণ না করলে বিরোধী দলের যে ভূমিকা, সেটাই তারা পালন করবেন।
জাতীয় সংসদের এক সেকেন্ড সময়ও নষ্ট না হোক, জামায়াত সেটি প্রত্যাশা করে না উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা প্রত্যাশা করি না যে জাতীয় সংসদ হবে কারও চরিত্রহননের কেন্দ্রবিন্দু; বরং জাতীয় সংসদ হবে দেশের সমস্যার সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু। যে সমস্ত ব্ল্যাক ল (কালো আইন) এখনো আমাদের সংবিধানে রয়ে গেছে, আমরা সম্মিলিতভাবে সেগুলো দূর করার প্রয়াস চালাব। আর জাতিকে একটা সুস্থ, বিকশিত, সম্মানের জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে দাঁড় করানোর জন্য যে আইন সংযোজনের প্রয়োজন, আমরা প্রত্যাশা করব যে সরকারি দল এবং বিরোধী দল মিলে সেভাবেই আমরা অগ্রসর হব। যদি এই রাজনীতিটা আমরা করতে পারি, তাহলে অতীতের রাজনীতির যে হতাশাজনক ধারা এখন পর্যন্ত জাতিকে গ্রাস করে আছে, তার করাল গ্রাস থেকে আশা করি জাতি মুক্তি পাবে ইনশা আল্লাহ।’
২০১৩ সালের আজকের দিনটি জাতির জন্য একটি অন্ধকার দিবস ছিল উল্লেখ করে জামায়াত আমির দাবি করেন, ‘দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে সেদিন একটি বিকৃত আদালত মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছিল। এর প্রতিবাদে শুধু জামায়াতের দলীয় কর্মীরা নয়, সারা দেশের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। এই প্রতিবাদকে দমন করার জন্য সরকার অস্ত্রের ভাষা খুঁজে নিয়েছিল। এক দিনে ৭০ জন আর এক সপ্তাহের মধ্যে ১৬৪ জনকে খুন করা হয়েছিল।’
গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, কামারুজ্জামান, আব্দুল কাদের মোল্লা, মীর কাসেম আলীসহ জামায়াতের সাবেক ১১ জন শীর্ষ নেতাকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পৃথিবী থেকে বিদায় করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন শফিকুর রহমান। এসব হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় তিনি সাবেক বিরোধীদলীয় নেতা বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন প্রয়াত খালেদা জিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
আজকের জামায়াতের এই ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সঞ্চালক ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
অনুষ্ঠানে সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্য ও নেতারা, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের পাশাপাশি বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, সাবেক বিচারপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, কৃষিবিদ, চিকিৎসক, ওলামা-মাশায়েখ, কবি-সাহিত্যিক, ব্যবসায়ী, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচিত নেতারাসহ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।