রাজনৈতিক মিছিলে বা প্রতিবাদে সম্প্রতি একটি স্লোগান আলোচনায় এসেছে—যার শুরু হয় ‘১, ২, ৩, ৪’ দিয়ে এবং শেষে অশ্লীল শব্দ যুক্ত হয়। এতটাই অশ্লীল যে ভদ্রসমাজে উচ্চারণও অশোভন। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, অডিও–ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে এমন শব্দ এলে তা ‘টুট-টুট’ শব্দ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়, আর লিখিত মাধ্যমে রাখা হয় ‘…’।
১১ জুলাই লাল চাঁদ হত্যার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট ও ইডেন কলেজে ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ ব্যানারে মিছিল হয়। এসব মিছিলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে অশ্লীল স্লোগান দিতে দেখা যায়। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়।
স্লোগানে গালির সূচনা ও প্রেক্ষাপট
যুক্তরাষ্ট্রের বার্ড কলেজের শিক্ষক ফাহমিদুল হক মনে করেন, বাংলাদেশে স্লোগানে গালির ব্যবহার প্রথম দেখা যায় নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জেন–জিরা নিজেদের প্রকাশে কখনো কখনো গালি ব্যবহার করে, যা পুরোনো প্রজন্মকে অস্বস্তিতে ফেলে। তবে তিনি মনে করেন, সৃজনশীল স্লোগানের পাশাপাশি সীমিত আকারে গালির ব্যবহার প্রতিবাদের ক্ষোভ প্রকাশে কার্যকর হলেও, রাজনীতিতে এর ঘনঘন ব্যবহার এখন বিরক্তিকর ও অশোভন মাত্রা পেয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
লাল চাঁদ হত্যাকাণ্ডের পর বিএনপি কয়েকজন কর্মীকে বহিষ্কার করলেও, মিছিলে অশ্লীল স্লোগানের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে—এসব কি সত্যিই শিক্ষার্থীদের উদ্যোগ, নাকি সংগঠিত রাজনৈতিক কৌশল? বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেন, ঘটনাটি রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে।
অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতা মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম বলেন, সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীরা কুরুচিপূর্ণ স্লোগান দিলে তা কোনোভাবেই রাজনৈতিক শিষ্টাচার বা প্রতিবাদের ভাষার মধ্যে পড়ে না। বিশ্লেষক গোলাম মাওলা রনি সতর্ক করেছেন, এ ধরনের স্লোগান ভবিষ্যতে নেতিবাচক পরিণতি ডেকে আনবে। অভিনেত্রী শাহনাজ খুশিও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, একসময় স্লোগান মানুষকে অনুপ্রাণিত করত, এখন তা শুনে বিব্রত হয়ে ফোনের সাউন্ড বন্ধ করতে হয়।
অশ্লীলতার বিস্তার ও প্রভাব
শুধু রাজনীতি নয়, বিচার অঙ্গনেও অশ্লীল স্লোগানের ব্যবহার দেখা গেছে। ২০২৩ সালে এক শুনানিতে হাইকোর্ট পর্যন্ত মন্তব্য করেন—“কমলাপুরের কুলিরাও এমন ভাষা ব্যবহার করে না।”
অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, গণ–অভ্যুত্থান, কিংবা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে স্লোগান ছিল জনগণের শক্তির উৎস। যেমন—“লাখো শহীদের দামে কেনা, দেশটা কারও বাপের না” কিংবা “এক দফা, এক দাবি, স্বৈরাচার তুই কবে যাবি”—এসব স্লোগান মানুষকে রাজপথে নামতে প্রেরণা দিয়েছিল। অথচ আজকের অশ্লীল স্লোগান সেই ঐতিহ্যকে কলুষিত করছে।
সমাধানের পথ কোথায়?
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, অশ্লীল স্লোগান রাজনৈতিক সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতারই বহিঃপ্রকাশ। রাজনৈতিক সহিষ্ণুতা যত কমছে, ভাষায় অশ্লীলতা তত বাড়ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল আই খান মনে করেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শিক্ষিত, দেশপ্রেমিক তরুণদের শুদ্ধ রাজনীতির চর্চায় এগিয়ে আসতে হবে।
ফাহমিদুল হক বলেন, নেতারা চাইলে কর্মীদের স্লোগানে শালীনতা বজায় রাখতে দিকনির্দেশনা দিতে পারেন। কারণ স্লোগান সময়ের প্রতিচ্ছবি—এটি গড়তে পারে প্রেরণার শক্তি, আবার অশালীন হলে রাজনীতির অবক্ষয়ের প্রতীকেও পরিণত হতে পারে।