অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের আলোচিত ‘থ্রি জিরো’ (শূন্য কার্বন নিঃসরণ, শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব) তত্ত্বের প্রবল সমর্থক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তবে তাঁর মতে, ইউনূস যখন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন, তখন উল্টো ধারায় অগ্রসর হয় সেই তত্ত্বের প্রয়োগ।
সোমবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি বলেন, “প্রধান উপদেষ্টা থাকা অবস্থায় ইউনূস সাহেবের থ্রি জিরো তত্ত্ব বাস্তবায়নের সুযোগ ছিল। অথচ আমরা দেখেছি, সে সময়েই কার্বন নিঃসরণ বেড়েছে, কারখানা বন্ধ হয়ে বেকারত্ব লাফিয়ে বেড়েছে, এবং দারিদ্র্য আরও বিস্তৃত হয়েছে। এই বিপরীতমুখী অগ্রযাত্রা তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করা প্রয়োজন। আমরা চাই, থ্রি জিরো তত্ত্বটি বাস্তবেই অগ্রসর হোক।”
বৈঠকটি যৌথভাবে আয়োজন করে বিআইজিডি (ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) ও প্রথম আলো।
রাজনৈতিক সংস্কার ও গণতন্ত্রের শর্ত
আনু মুহাম্মদ রাজনৈতিক দলগুলোর কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিয়ে বলেন, একটি দলকে জাতীয় পর্যায়ে গণতান্ত্রিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে দেশের সব ধর্ম, জাতি ও লিঙ্গের প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে। দলের অভ্যন্তরে নির্বাচনী প্রক্রিয়া থাকতে হবে এবং রাজনীতিবিদদের জন্য নির্দিষ্ট অবসরের বয়স নির্ধারণ করা উচিত।
অনলাইন হামলা ও মত প্রকাশের সংকট
তিনি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ব্যক্তিগত আক্রমণের প্রসঙ্গে বলেন, আজকাল মতপ্রকাশ করা কিংবা সক্রিয় থাকা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। শুধু আওয়ামী লীগ নয়, অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোও মতবিরোধী কাউকে সহজেই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।
আন্তর্জাতিক সংস্থার জবাবদিহি চাইলেন
অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রভাব নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন আনু মুহাম্মদ। তাঁর মতে, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, ও এডিবি সরাসরি সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করছে, অথচ তাদের কোনো জবাবদিহির কাঠামো নেই। এসব প্রতিষ্ঠানের নীতির ফলে জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার পৃষ্ঠপোষকতা জোরদার হচ্ছে।
গণতান্ত্রিক শক্তির সংজ্ঞা ও বিভাজনের বাস্তবতা
বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার লক্ষ্যে যারা কাজ করে, তাদেরই প্রকৃত গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে অভিহিত করেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, “যদি কেউ নারী-পুরুষ বৈষম্য, জাতিগত বা ধর্মীয় বৈষম্যকে মতাদর্শ হিসেবে লালন করে, তাহলে তাকে গণতান্ত্রিক শক্তি বলা যায় না। বৈষম্যমূলক ও বৈষম্যবিরোধী রাজনীতির মধ্যে মৌলিক বিভেদ রয়েছে এবং এই দুই ধারার মধ্যে জাতীয় ঐক্য সম্ভব নয়।”
অতীতের ঐক্য ও বর্তমান বিভক্তি
আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গড়ে ওঠা ঐক্যবদ্ধ ছাত্র ও রাজনৈতিক শক্তি নব্বইয়ের পর খণ্ডিত হয়ে পড়ে বলে মন্তব্য করেন তিনি। নির্বাচিত সরকার গঠনের পর সেই ঐক্য আরও দুর্বল হয়ে যায় এবং ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মতো গণতান্ত্রিক অনুশীলন বন্ধ হয়ে যায়।
সার্বিকভাবে আনু মুহাম্মদ মনে করেন, বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও জনগণের ঐক্যবদ্ধ শক্তির বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই গণতান্ত্রিক শক্তির পুনর্গঠন এবং সমাজে নতুন রাজনৈতিক চেতনার উত্থান জরুরি।