কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নের ঘটিভাঙ্গা খালের সেতু থেকে দূরে সোনাদিয়া দ্বীপের ঝাউগাছের সারি চোখে পড়ে। ঘটিভাঙ্গা খাল থেকে একটি সরু খাল সোনাদিয়ার দিকে গেলেও, ব্রিজ পেরোতেই খালের মুখে শক্ত মাটির বাঁধ দেখা যায়, যেখানে লবণ চাষ চলছে। লবণমাঠের পাশে ১০-১২ জন শ্রমিক লবণের স্তূপ তৈরি করছে। লবণমাঠ পেরিয়ে কিছুদূর হাঁটলে একটি মাঝারি বাইনগাছের চারপাশে হাজার হাজার কাটা ম্যানগ্রোভ গাছের গুঁড়ি ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, যেন কোনো ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় বনের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. সোহেল জানান, এই লবণমাঠ ও চিংড়িঘেরের জায়গায় একসময় বিস্তৃত প্যারাবন ছিল, যা গত কয়েক বছরে ধ্বংস করে চিংড়ি ও লবণ চাষ শুরু হয়েছে। সরু খালটি চিংড়িঘেরের জন্য খণ্ডিত করা হয়েছে, যা এখন দিঘিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এই ধ্বংসের পেছনে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত থাকলেও, সোহেল তাদের নাম প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানান। চারপাশে শুকনো গাছের কাণ্ড, শিকড় ও ডালপালা ছড়িয়ে আছে, যা প্যারাবনের বিশাল ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে।
মহেশখালী বন বিভাগের গোরকঘাটা রেঞ্জের রেকর্ড অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালে প্রথম মামলা হয় মকছুদ মিয়ার বিরুদ্ধে। ২০১০ থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত ১৯৬টি মামলায় প্রায় ৯৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে। ২০০৩ সালে মোশতাক আহমদ ও ২০১৩ সালে তার ছেলে শাজেদুল করিমের নাম মামলায় উঠে আসে। বিএনপি নেতা আলমগীর ফরিদের নামও দখলের সঙ্গে জড়িত, যদিও তার বিরুদ্ধে মামলা নেই। ২০০৭ সালে যৌথ বাহিনী তার পরিবারের চিংড়িঘের ধ্বংস করে। আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিকের বিরুদ্ধে দখলদারদের পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ রয়েছে। তার ফুপাতো ভাই শমসের উল্লাহও মামলায় আসামি।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, অভিযানের সময় আশেক উল্লাহ ফোন করে দখলদারদের জীবিকার কথা বলে বাধা দিতেন। জুলাই অভ্যুত্থানের পর তিনি এলাকায় নেই। বিএনপি নেতা আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ফরিদ দাবি করেন, আওয়ামী লীগের শেষ সময়ে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দখল বেড়েছে। তিনি স্বীকার করেন, তারও চিংড়িঘের ছিল, তবে সম্প্রতি মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে স্বেচ্ছাসেবক লীগের মহসিন আনোয়ার এবং ১৮ মে’র মামলায় কুতুবজোম বিএনপির আলমগীর চৌধুরী, ইউনিয়ন চেয়ারম্যান শেখ কামাল ও তার ভাই শেখ আলমগীরসহ ১০ জন আসামি।
শেখ কামাল দাবি করেন, তার কোনো চিংড়িঘের নেই এবং তিনি প্যারাবন নিধনের বিরুদ্ধে সোচ্চার। আলমগীর চৌধুরী বলেন, তার বাবার চিংড়িঘের আছে, তার নয়। রেঞ্জ কর্মকর্তা আইয়ুব আলী জানান, গোরকঘাটা ও চরণদ্বীপে ৪৬,২১০ একর প্যারাবনের মধ্যে ১২,৫৬৩ একর দখল হয়েছে। ২০২১ সালে বেজার হাতে সোনাদিয়া হস্তান্তরের পর ধ্বংস বেড়েছে, যদিও সম্প্রতি বেজার বন্দোবস্ত বাতিল হয়েছে।
মহেশখালীর ইউএনও হেদায়েত উল্লাহ জানান, ৪৫ কিলোমিটার বাঁধ শনাক্ত করা হয়েছে, যার অপসারণে ৪ কোটি ২০ লাখ টাকার বাজেট চাওয়া হয়েছে। নৌবাহিনী নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। তিনি বলেন, স্থায়ী আনসার ক্যাম্প বা বনবিট না হলে দুর্বৃত্তরা দুর্গমতার সুযোগ নেয়।
প্যারাবন দখলে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়। খালে বাঁধ দিয়ে পানি বন্ধ করে গাছ কাটা হয়, তারপর শুকিয়ে পুড়িয়ে জমি পরিষ্কার করা হয়। ইয়ুথ ফর ইকোলজি কনজারভেশনের এস এম রুবেল বলেন, প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্যারাবন ধ্বংস হচ্ছে, যা ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে ঝুঁকিতে ফেলছে।
শিক্ষক ও কবি সিরাজুল হক সতর্ক করে বলেন, প্যারাবন ধ্বংসে বেড়িবাঁধ দুর্বল হচ্ছে এবং বৈশ্বিক উষ্ণতায় দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
লবণ চাষে একরপ্রতি বছরে ৮ লাখ টাকা এবং ৫০০ একরের চিংড়ি প্রকল্পে ২-২.৫ কোটি টাকা আয় হয়। সোনাদিয়ায় ৫০টি এবং আশপাশে ১৫টি চিংড়ি প্রকল্প রয়েছে। মামলাগুলো ১০-১৫ বছর ধরে ঝুলে থাকে, কোনো শাস্তি হয় না।
‘ওয়াটার্সকিপার্স বাংলাদেশ’ জানায়, ২০১৫ সালের পর স্পুন-বিলড স্যান্ডপাইপার সোনাদিয়া থেকে হারিয়ে গেছে। দ্বীপের ২৫০ প্রজাতির মাছ, ১৭০ প্রজাতির পাখি, ডলফিন, কাছিমসহ অর্ধেকের বেশি প্রজাতি বিলুপ্ত। গবেষক ইকবাল ফারুক বলেন, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্যারাবন পুনরুদ্ধার জরুরি।