বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা গত ১৭ বছরে শেখ হাসিনার ‘দুঃশাসনের’ বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নেননি বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি’ উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, “যাঁরা আজ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁদের মধ্যে একমাত্র আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ছাড়া কেউই গত ১৭ বছরে শেখ হাসিনার দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেননি। এমনকি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসও নীরব থেকেছেন।”
হাফিজ উদ্দিনের মতে, ২০০৭ সালের অভ্যুত্থানের পর যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তারা শহীদদের আদর্শ ও স্বপ্ন ধারণ করে না। তিনি বলেন, “আমরা দুঃখজনকভাবে এমন এক রাষ্ট্রে বাস করছি, যেখানে বীরদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হয় না। বিপ্লবের পর রাজনৈতিক সুবিধাবাদীরাই সামনে এসে কৃতিত্ব দাবি করে এবং সাধারণ মানুষ যে ত্যাগ স্বীকার করে, তার স্বীকৃতি মেলে না।”
গণ-আন্দোলনের পটভূমি বিএনপিই তৈরি করেছে দাবি করে তিনি বলেন, “যাঁরা কখনো হাসিনার বিরুদ্ধে মুখ খোলেননি, এখন তারাই জাতিকে জ্ঞান দিচ্ছেন, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন।”
তিনি আরও বলেন, “জুলাই-আগস্টে যারা জীবন দিয়েছেন, তারা কোনো নির্দিষ্ট ভোট পদ্ধতির (যেমন পিআর বা আসনভিত্তিক) জন্য জীবন দেননি। তারা জীবন দিয়েছেন গণতন্ত্রের জন্য। গণতন্ত্রের একমাত্র পথ হচ্ছে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন।”
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের উদ্দেশে হাফিজ উদ্দিন বলেন, “যাঁরা একবার ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছেন, তারা এখন ক্ষমতা ছাড়তে চান না। তারা শুধু রাজনৈতিক কৌশল আর বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। সংস্কার দরকার, তবে সেটি হতে হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে।”
তিনি সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দ্বারা সংবিধান সংশোধনের কোনো নজির নেই। অথচ এখন সেই চেষ্টাই চলছে। ১৯৭২ সালের সংবিধান আমরা রক্ত দিয়ে রচনা করেছি, সেটিকে কেউ ছুড়ে ফেলতে পারে না।”
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ এনে হাফিজ উদ্দিন বলেন, “মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ৮০ হাজার থেকে এখন তালিকা দাঁড়িয়েছে আড়াই লাখে। আত্মীয়-স্বজনদের নাম ঢোকাতে সরকার সুযোগ নিয়েছে। আর দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে সরকার পালানোর আগে পরিবারের সদস্যদের বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ায়।”
তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন ছাড়া দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে না, কেউ বিনিয়োগে আগ্রহী হবে না। বর্তমানে ‘মবক্রেসি’ ও ‘অ্যারিস্টোক্রেসি’ চলছে, যা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি।
এ সময় সেনাবাহিনীর সমালোচনা করে হাফিজ উদ্দিন বলেন, “জুলাই-আগস্টে এমন আন্দোলন হয়েছিল, যেখানে মসজিদের খতিব পর্যন্ত পালিয়ে গেছেন। প্রধান বিচারপতি ও ছয় শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তা গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা করে সেনানিবাসে আশ্রয় নেন, আর সেনাবাহিনী তাঁদের সে আশ্রয় দেয়।”
আলোচনাসভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, “ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু সেই ঐক্যে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা হচ্ছে, দেশি-বিদেশি উভয় পক্ষ থেকেই। স্বৈরাচার এখনো সক্রিয়, তাদের কাছে অর্থ, অস্ত্র ও দোসর আছে।”
তিনি আরও বলেন, “কেউ কেউ কথায় কথায় সমালোচনা করছেন। তবে আগে আয়নায় নিজের মুখ দেখা উচিত। আজকাল অনেক কিছু পত্রিকায় বের হচ্ছে, আমরা এসবকে গুরুত্ব দিচ্ছি না। তবে যারা রাজনীতি করতে চান, তাঁদের ঐক্য রক্ষা করতেই হবে।”