যুক্তরাজ্যের সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে নিজের মতামত জানিয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণাপত্র পাঠ করার পর বার্গম্যান ফেসবুকে একটি দীর্ঘ পোস্টে প্রতিক্রিয়া দেন। তিনি লেখেন:
১. ঘোষণাপত্রের পক্ষপাতমূলক বয়ান:
ঘোষণাপত্রে উপস্থাপিত ইতিহাস বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আওয়ামী লীগবিরোধী ও একপেশে। মনে হয়েছে, যারা আওয়ামী লীগকে ঘৃণা করেন, তাদের দৃষ্টিভঙ্গিই এখানে প্রাধান্য পেয়েছে। দলটি ক্ষমতায় থাকাকালীন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা হয়েছে, তবে সমালোচনার ধরন রাজনৈতিক বৈরিতার পর্যায়ে চলে গেছে। পুরো নথি অনেকটাই মনে হয়েছে আওয়ামী লীগবিরোধী দীর্ঘদিনের সমালোচকদের লেখা বক্তব্য।
২. রাজনৈতিক পক্ষপাতের তুলনা:
বার্গম্যানের মতে, এ ঘোষণাপত্রের পক্ষপাত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আওয়ামী লীগ যে পক্ষপাতমূলক ইতিহাস লিখেছিল, তার চেয়েও বেশি। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলের ইতিহাসকে যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, তা কোনো নিরপেক্ষ নথি নয়; বরং বিরোধী দলগুলোর প্রচারণার মতো।
৩. ইতিহাস বিকৃতি ও তথ্য বাদ দেওয়ার অভিযোগ:
তিনি উল্লেখ করেন, ঘোষণাপত্রে—
- ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বাদ দিয়ে কেবল বাকশাল তুলে ধরা হয়েছে।
- শেখ মুজিব ও তাঁর পরিবারের হত্যাকাণ্ডের উল্লেখ নেই।
- জিয়াউর রহমানের শাসনকালকে ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ হিসেবে glorify করা হয়েছে।
- ১/১১ ঘটনাকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে বর্ণনা করা হলেও প্রকৃতপক্ষে সেটি ছিল বিএনপির কারচুপি ঠেকাতে সামরিক হস্তক্ষেপ।
- আওয়ামী লীগকে ১৬ বছরের পুরো শাসনকালজুড়ে ‘ফ্যাসিস্ট ও গণবিরোধী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নারীশিক্ষা, অবকাঠামো ও জলবায়ু অভিযোজনের সাফল্যগুলো পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে।
৪. বিতর্কিত প্রস্তাবনা:
ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, এটি ভবিষ্যতে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে—যা বার্গম্যানের মতে “লজ্জাজনক”। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, আইনের শাসনের কথা বলার পরও আন্দোলনে সহিংসতার দায়ীদের দায়মুক্তি দেওয়ার ইঙ্গিত থাকাটা সমস্যাজনক।
৫. কিছু ইতিবাচক দিক:
বার্গম্যান স্বীকার করেছেন, ঘোষণাপত্রে ১৯৭১ সালের যুদ্ধকে সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে, সাম্প্রতিক অভ্যুত্থান ও জনআকাঙ্ক্ষার বাস্তব চিত্রও বর্ণনা করা হয়েছে। এছাড়া সুশাসন, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার, দুর্নীতি দমন ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতিগুলো ইতিবাচক।
৬. মুহাম্মদ ইউনূসের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা:
বার্গম্যানের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের নেতা হিসেবে ইউনূসের এ ঘোষণায় সই করা তাঁর নিরপেক্ষ ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তিনি একসময় অরাজনৈতিক ও ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে জনপ্রিয় ছিলেন। কিন্তু এ ঘোষণার মাধ্যমে তিনি স্পষ্টতই রাজনৈতিক ময়দানে প্রবেশ করেছেন।
তিনি আরও বলেন, ঘোষণাপত্র দীর্ঘ হয়েছে; ১৯৭১-এর ইতিহাস ব্যতীত অন্য রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশগুলো বাদ দিলে এটি সংক্ষিপ্ত ও কার্যকর হতে পারত।
পরিশেষে, আজ সকালে আরেকটি পোস্টে বার্গম্যান স্বীকার করেছেন, ইউনূসকে নিয়ে তাঁর সমালোচনা হয়তো কিছুটা বেশি সরাসরি হয়েছে। তবে তিনি নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেছেন—সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও ইউনূস সরকারের কিছু ভালো কাজের প্রতি তিনি সমর্থন জানাবেন।