৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, মঙ্গলবার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে, সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত আটটি কেন্দ্রে ৮১০টি বুথে। মোট ৩৯,৮৭৪ ভোটার, যার মধ্যে ১৮,৯৫৯ জন ছাত্রী এবং ২০,৯১৫ জন ছাত্র, ডাকসুর ২৮টি পদে ৪৭১ জন এবং ১৮টি হল সংসদের ২৩৪টি পদে ১,০৩৫ জন প্রার্থীর মধ্যে পছন্দের প্রতিনিধি বেছে নিচ্ছেন। প্রথমবারের মতো ব্রেইল পদ্ধতিতে ভোটদানের ব্যবস্থা এবং হলের বাইরে ভোটকেন্দ্র স্থাপন নির্বাচনকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করেছে। তবে, ভোটের পরিবেশ নিয়ে উঠেছে বেশ কিছু অভিযোগ, যা নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
ভোট গ্রহণের পরিবেশ
সকাল সাড়ে ৭টায় সাংবাদিকদের সামনে ব্যালট বাক্স সিল করা হয়। উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সকাল ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত ৩৫% ভোট পড়েছে, যেখানে ৬,১৫৫ জন ভোটার রয়েছেন। ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) রোকেয়া হলের ৫,৬৪১ ভোটারের মধ্যে প্রথম ঘণ্টায় ৭০০ জন ভোট দিয়েছেন। রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক নাসরিন সুলতানা জানান, “মেয়েরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিচ্ছেন। নির্বিঘ্নে ভোট চললে সময়ের আগেই শেষ হবে।” তবে, প্রার্থীদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় ভোট দিতে সময় লাগছে। জসীম উদ্দীন হলের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, “যারা পরিকল্পনা ছাড়া এসেছেন, তাদের সময় বেশি লাগছে, তবে পরিবেশ স্বাভাবিক।”
বিতর্ক: প্রার্থীর ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ
ছাত্রদল প্যানেলের সহ-সভাপতি (ভিপি) প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান সকাল সাড়ে ৮টায় শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রের জগন্নাথ হলের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করেন, যা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। রিটার্নিং কর্মকর্তা কাজী মোস্তাক গাউসুল হক প্রথমে বলেন, “প্রার্থীদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের সুযোগ নেই,” কিন্তু পরে জানান তিনি ঘটনাটি দেখেননি এবং ব্যবস্থা নেবেন। আবিদুল দাবি করেন, তিনি কর্মকর্তার অনুমতি নিয়েই প্রবেশ করেছেন। নির্বাচনী আচরণবিধির ১২(খ) ধারায় প্রার্থীদের প্রবেশের অনুমতি থাকলেও, তিনি গণমাধ্যমে গুজব ছড়ানোর অভিযোগ করেন, বলেন, “প্রকাশের আগে যাচাই করা উচিত।”
অনিয়মের অভিযোগ
আবিদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, অমর একুশে ও রোকেয়া হলে পূরণকৃত ব্যালট দেওয়া হয়েছে, এবং নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ। ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী খায়রুল হাসান জানান, ইউ ল্যাব কেন্দ্রে তাদের পোলিং এজেন্টকে বের করে ছাত্রদলের এজেন্টদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “ছাত্রদলের ছয়জন এজেন্ট ঢুকলেও আমাদের একজনকেও ঢুকতে দেওয়া হয়নি।” প্রতিরোধ পর্ষদের প্রার্থী মেঘমল্লার বসু, হুইলচেয়ারে ভোট দিতে এসে, বলেন, “প্রগতিপক্ষের শক্তির জয় হবে,” তবে পোলিং এজেন্ট পরিবর্তনের অভিযোগ তুলে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন।
দুঃখজনক ঘটনা: সাংবাদিকের মৃত্যু
কার্জন হলে ভোট সংগ্রহের সময় চ্যানেল এস-এর সাংবাদিক তরিকুল ইসলাম শিবলী (৪০) অচেতন হয়ে পড়েন। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক হৃদরোগে মৃত্যুর কথা জানান। এই ঘটনা নির্বাচনের উৎসাহী পরিবেশে শোকের ছায়া ফেলেছে।
প্রশাসনের পদক্ষেপ
কার্জন হলের অমর একুশে হলের ভোটকেন্দ্রে এক শিক্ষার্থীকে অনিচ্ছাকৃতভাবে দুটি ব্যালট দেওয়ায় পোলিং অফিসার জিয়াউর রহমানকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় জনসংযোগ দপ্তর জানায়, এটি অনিচ্ছাকৃত ভুল ছিল, এবং প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিয়েছে। ভোটকেন্দ্রে মুঠোফোন ও ব্যাগ রাখার জায়গা এবং পানি-স্যালাইনের ব্যবস্থার অভাব নিয়ে উমামা ফাতেমা অভিযোগ করেন, বলেন, “দীর্ঘ সারিতে ভোটারদের কষ্ট হচ্ছে।”
শিক্ষার্থীদের উৎসাহ
প্রাণিবিদ্যার শিক্ষার্থী নাফিসা আনজুম টিএসসিতে ভোট দিতে এসে বলেন, “উত্তেজনায় রাতে ঘুম হয়নি। জীবনে প্রথম ভোট দিচ্ছি।” নৃত্যকলার অর্পিতা সাহা বলেন, “গণতান্ত্রিক অধিকার পূরণে অন্যরকম ভালো লাগছে।” রাকিবুল ইসলাম, অ্যাপ্লায়েড কেমিস্ট্রির শিক্ষার্থী, বলেন, “রাত জেগে ৪১ জন প্রার্থী বাছাই করেছি। আমাদের ভোটে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।” প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন জানান, বিকেল ৪টার মধ্যে কেন্দ্রে প্রবেশকারী সবাই ভোট দিতে পারবেন।
নির্বাচনের প্রত্যাশা
স্বতন্ত্র প্রার্থী উমামা ফাতেমা বলেন, “আমরা ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশন চাই। ৩০,০০০-এর বেশি ভোট পড়বে।” বৈষম্যবিরোধী প্যানেলের আবু বাকের মজুমদার বলেন, “শিক্ষার্থীরা যোগ্য নেতৃত্ব বেছে নেবেন।” ছাত্রদলের শেখ তানভীর বারী হামিম জয়ে শতভাগ আশাবাদী, অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের ভোট দিতে আহ্বান জানান। নির্বাচনে ১০টি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, যার মধ্যে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, প্রতিরোধ পর্ষদ ও স্বতন্ত্ররা মূল প্রতিযোগী। নিরাপত্তায় পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন রয়েছে।
এই নির্বাচন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের একটি মাইলফলক, তবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ফলাফল নিশ্চিত করা প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।