গত সাড়ে আট মাস ধরে সংস্কারের আলোচনার টেবিলে বসে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের (এনসিসি) চারপাশে ঘুরপাক খাওয়া রাজনীতি এখন আবার রাজপথে নেমেছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ শীর্ষ দলগুলোর মাঠের কর্মসূচি—একদিকে জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে ভিন্নমত, অন্যদিকে ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের দ্রুত আগমন—এই দ্বৈততায় রাজনৈতিক উত্তেজনা আবার জ্বলে উঠেছে। এই তৎপরতা কি নির্বাচনী প্রস্তুতির অংশ, নাকি মাঠ উত্তপ্ত করে চাপ সৃষ্টির কৌশল? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দুটোই মিশিয়ে চলছে, যা সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
জুলাই সনদ: ঐক্য থেকে বিভেদের পথে
গত বছর ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর সংস্কারের আলোচনা শুরু হয়। ১২ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে গঠিত এনসিসি সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রিয়াজের অধ্যয়নে সাড়ে আট মাসে ৩০টি দলের সঙ্গে টানা বৈঠক করে ১৭ অক্টোবর জুলাই সনদ প্রণয়ন করে। অধিকাংশ দল সই করে, কিন্তু বাস্তবায়নের পথ নিয়ে ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি। ৩ নভেম্বর সরকার বলে, রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সমাধান করুক—কিন্তু তার বদলে দলগুলো রাজপথের দিকে ঝুঁকেছে।
বিএনপি চায় গণভোট ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিনই হোক, যাতে খরচ কমে এবং মূল নির্বাচনের গুরুত্ব অটুট থাকে। দলটি ৩ নভেম্বর ২৩৭ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে নির্বাচনী যাত্রা শুরু করেছে। গত ৭ নভেম্বর ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে’ ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, কুমিল্লা, বরিশাল, সিলেট, ময়মনসিংহ, বগুড়াসহ সব বিভাগ-জেলায় সমাবেশ ও শোভাযাত্রায় ব্যাপক জনসমাগম ঘটায়। এসব কর্মসূচিতে ধানের শীষের নির্বাচনী পোস্টার, ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড প্রদর্শিত হয়, যা ঐতিহাসিক স্মরণের পাশাপাশি নির্বাচনী প্রচারের সূচনা। বিএনপির সূত্র বলছে, সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠে সক্রিয়, ভোটকেন্দ্রভিত্তিক কমিটি পুনর্গঠন চলছে।
ঢাকা সমাবেশে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “জামায়াতসহ আট দলের গণভোটের দাবিকে নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করেন।” তিনি সতর্ক করেন, “নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে হতে হবে, অন্যথায় জনগণ মেনে নেবে না।” স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী যোগ করেন, “কথায় কথায় রাস্তায় যাবেন। অন্য দল প্রতিবাদে রাস্তায় নামলে সংঘর্ষ হবে না? এ জন্য কি আমরা শেখ হাসিনাকে বিদায় দিয়েছি?”
জামায়াতের চাপ: গণভোট নভেম্বরেই চাই
জামায়াতে ইসলামীসহ আট ইসলামপন্থী দল (খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপা, নেজামে ইসলাম পার্টি, ডেভেলপমেন্ট পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী আন্দোলন) নভেম্বর মধ্যে গণভোটসহ পাঁচ দাবিতে (জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, উচ্চকক্ষে পিআর, নির্বাচনে দুই কক্ষে পিআর) আন্দোলন চালাচ্ছে। গত ৩০ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনে স্মারকলিপি জমা দিয়ে ৬ নভেম্বর শাপলা চত্বরে সমাবেশ করে। ১১ নভেম্বর ঢাকায় লাখো মানুষ নামিয়ে কঠোর আন্দোলনের হুমকি দিয়েছে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “বিএনপির আচরণে আওয়ামী লীগের সুর মিলছে। আমরা তাদের আহ্বানে সাড়া না দেওয়ার সিদ্ধান্তকে বিগত রেজিমের ‘ওমুকের সঙ্গে বসব না’ মেন্টালিটির সঙ্গে তুলনা করেছি। এ কালচার থেকে বের হতে হবে।” জামায়াত জুলাই সনদকে অভ্যুত্থানের চেতনার অংশ বলে গণভোটকে আগে চায়, যাতে সংস্কার নিশ্চিত হয়।
এনসিপি, আওয়ামী লীগের ছায়া
অভ্যুত্থানের তরুণ নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গণভোট আগে চায়, কিন্তু বিএনপির ‘নোট অফ ডিসেন্ট’ বাদ দিয়ে চেয়ারপতির আদেশে বাস্তবায়ন। এনসিপি এখনো বড় কর্মসূচি ঘোষণা করেনি। কার্যক্রমনিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ১৩ নভেম্বর ঢাকায় ‘লকডাউন’ ঘোষণা করেছে, যা শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির জুলাই অভ্যুত্থানের মানবতাবিরোধী অপরাধের রায় ঘোষণার সঙ্গে যুক্ত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক, কারণ এতে রাজপথে নামার আশঙ্কা।
৭-১১-১৩: উত্তপ্ত নভেম্বরের টাইমলাইন
তিন ধারাবাহিক কর্মসূচি—৭ নভেম্বর বিএনপির সমাবেশ, ১১ নভেম্বর জামায়াতের ঢাকা সমাবেশ, ১৩ নভেম্বর আওয়ামী লীগের লকডাউন—নভেম্বরকে সবচেয়ে স্পর্শকাতর করে তুলেছে। বিএনপি-জামায়াতের বিপরীতমুখী দাবি (গণভোটের সময়) আওয়ামী লীগকে সুযোগ দিতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। কিন্তু বিএনপি-জামায়াতের সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগের প্রতি কোনো নমনীয়তা নেই—যা সংস্কারের সিদ্ধান্তে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পারে।
রাজনৈতিক দলগুলোর মাঠের তৎপরতা নির্বাচনী প্রস্তুতি এবং চাপ সৃষ্টির মিশ্রণ, কিন্তু সংঘর্ষ এড়াতে হিসাবি পদক্ষেপ দরকার। নভেম্বরের এই উত্তাপ পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ফিরিয়ে এনেছে, যা ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পথে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।