বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে খ্যাত বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া জীবনের পরম সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। জননন্দিত এই নেত্রীর চিরপ্রস্থান দেশবাসীর মনে গভীর শোক ও মর্মবেদনা জাগিয়েছে।
রাজনীতির জীবনে উত্থান-পতন, মামলা-মোকদ্দমা, গ্রেপ্তার-কারাবাস, নির্যাতন, প্রতিপক্ষের আক্রমণ—এসব ঝুঁকি তিনি সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন। স্বামী ও সন্তান হারানোর গভীর শোক এবং দীর্ঘদিনের রোগযন্ত্রণাও সহ্য করেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের কঠিন সময়ে দুই শিশুপুত্রকে নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে ঠিকানা বদলে আত্মগোপন করে থাকতে হয়েছিল তাঁকে। ১৯৭১ সালের ২ জুলাই সিদ্ধেশ্বরীর এক বাসা থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তার করে সেনানিবাসে যুদ্ধবন্দী করে রাখে। যুদ্ধের ভয়াবহ দিনগুলো একাকী অতিক্রম করতে হয়েছিল।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে ১৯৮৩ সালে ৭ দলীয় ঐক্যজোট গঠন করেন। ১৯৮৬ সালে জাতির কাছে দেওয়া অঙ্গীকার রক্ষা করে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধি লাভ করেন। ১৯৮৭ সাল থেকে ‘এরশাদ হটাও’ একদফা আন্দোলন শুরু করেন।
রাজনৈতিক জীবনে মতাদর্শিক সংঘাতের পাশাপাশি প্রতিপক্ষের ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ ও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর সেনানিবাসের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়—সেদিন গণমাধ্যমের সামনে অশ্রুসজল অবস্থায় দেখা যায় তাঁকে। অজস্র কঠিন মুহূর্তে পরম ধৈর্য, আত্মশক্তি ও আত্মমর্যাদা বজায় রেখে অনমনীয় দৃঢ়তায় জীবন অতিবাহিত করেছেন। এই চারিত্রিক মহত্ত্ব তাঁকে মহীয়ান করে তুলেছে।
শৈশব ও যৌবন ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করেন খালেদা জিয়া। বাবা ইস্কান্দার মজুমদারের বাড়ি ফেনীর পরশুরামে, মা তৈয়বা বেগমের জন্ম পঞ্চগড়ের বোদায়। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয় তিনি। শৈশবে ‘পুতুল’ ডাকনামে পরিচিত ছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষা সেন্ট জোসেফ কনভেন্টে, ম্যাট্রিক দিনাজপুর সরকারি স্কুল থেকে এবং ইন্টারমিডিয়েট সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে পাস করেন। শৈশব থেকে পরিচ্ছন্নতা ও ফুলের প্রতি অনুরাগ ছিল তাঁর। নিজের ঘর ফুল দিয়ে সাজাতেন। পরবর্তী জীবনেও এই অভ্যাস বজায় রেখেছিলেন।
বিয়ে ও সংসার ১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিয়ে হয়। বড় ছেলে তারেক রহমানের জন্ম ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর, ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর জন্ম ১৯৭০ সালের ১২ আগস্ট। কোকো ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ায় হৃদরোগে মারা যান। জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০ মে শহীদ হলে ৩৬ বছর বয়সে বৈধব্য বরণ করেন খালেদা জিয়া। পরিমিত আহার করতেন, ফল পছন্দ করতেন, বিশেষ করে পেঁপের রস। প্রিয় খাবার ছিল সাদা ভাত, সবজি, মসুর ডাল ও মাছ। অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন।
রাজনৈতিক জীবন জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপির সদস্যপদ গ্রহণ করেন। ধীরে ধীরে ভাইস চেয়ারপারসন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হয়ে দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নেন। ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনের ৪১ বছরই বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব দিয়েছেন।
সাফল্য ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের মাধ্যমে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে আরও দুবার প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৯৬ ও ২০০৯ সালে বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত ২৩টি আসনে নির্বাচন করে কখনো পরাজিত হননি। দীর্ঘ সফরে পারদর্শী ছিলেন—২০০৮ নির্বাচনের ১৪ দিন আগে প্রায় ১৪ হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করেছিলেন। তবে দুর্নীতি দমনে সফল না হওয়া এবং ‘হাওয়া ভবন’ প্রসঙ্গে বিরোধীপক্ষের সমালোচনা রয়েছে।
কারাবাস মুক্তিযুদ্ধের সময় সেনানিবাসে বন্দী ছিলেন। জিয়ার শাহাদাতের পর গৃহবন্দী। ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ‘ওয়ান-ইলেভেন’র সময় গ্রেপ্তার হয়ে এক বছর সাত দিন সাবজেলে ছিলেন। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতির মামলায় সাজা হয়ে দুই বছরের বেশি কারাবাস করেন। ২০২০ সালের ২৫ মার্চ নির্বাহী আদেশে মুক্তি পান।
চিকিৎসা ও প্রয়াণ চলতি বছরের জানুয়ারিতে লন্ডনে চিকিৎসা করিয়ে স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়েছিল। কিন্তু নানা জটিলতা ও ধকল সহ্য করে দুর্বল হয়ে পড়েন। গত ২৩ নভেম্বর শেষবার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসায় আর সাড়া দিতে পারেননি। ‘দেশনেত্রী’ খালেদা জিয়া চিরবিদায় নিয়েছেন প্রিয় দেশবাসীর কাছ থেকে।