বুধবার ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

পুরোনো মুখের সঙ্গে নতুন চমক, বড় মন্ত্রিসভা ঘোষণা 

ফেব্রুয়ারি 18, 2026
পুরোনো মুখের সঙ্গে নতুন চমক, বড় মন্ত্রিসভা ঘোষণা 

দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরে এসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর ৫০ সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা ঘোষণা করেছেন, যেখানে জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে মধ্যম সারির নেতা এবং তরুণ প্রজন্মের অনেককেই স্থান দেওয়া হয়েছে। 

গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাঁদের শপথবাক্য পাঠ করান। এর মাধ্যমে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নতুন সরকারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে। 

৫০ সদস্যের এই নতুন মন্ত্রিসভার তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রাষ্ট্র পরিচালনায় তিন প্রজন্মের নেতাদের সমন্বয়ে এটি গঠিত হয়েছে। অনেকেই জীবনে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েই মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। মন্ত্রিসভায় নতুন মুখের সংখ্যাই অধিক। কেউ কেউ বয়স ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার তুলনায় ভারী দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। আবার কিছু নাম এমনও রয়েছে, যা খুব একটা উৎসাহজনক নয়। 

বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ এবং মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ মন্ত্রিসভায় শপথ নিয়েছেন। তাঁদের অন্তর্ভুক্তি প্রত্যাশিত ছিল। 

তবে স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও আবদুল মঈন খানকে নতুন মন্ত্রিসভায় রাখা হয়নি। শোনা যাচ্ছে, খন্দকার মোশাররফকে রাষ্ট্রপতি এবং আবদুল মঈন খানকে সংসদের স্পিকার করার আলোচনা চলছে। সম্ভবত এ কারণেই তাঁদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। 

মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, সেলিমা রহমানসহ স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্যের নামও মন্ত্রিসভায় নেই। তবে মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খানসহ ১০ জনকে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়েছে। মন্ত্রী পদমর্যাদার অন্যান্য উপদেষ্টারা হলেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, সাবেক সচিব মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। 

প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টা নিয়োগ পেয়েছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবীর, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামসুল ইসলাম, ডা. জাহেদ উর রহমান, মাহদি আমিন এবং রেহান আসিফ আসাদ। তাঁদের মধ্যে শামসুল ইসলাম বিএনপির চেয়ারম্যানের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা ছিলেন। রেহান আসিফ আসাদ একজন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং বরেন্দ্র বহুমুখী প্রকল্পের প্রতিষ্ঠাতা ড. আসাদুজ্জামানের ছেলে। মাহদি আমিন বিএনপির চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ছিলেন। 

গত রাতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। 

নতুন মন্ত্রিসভায় সবচেয়ে আলোচিত সংযোজন হলেন খলিলুর রহমান, যিনি অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। অতীতে কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা পরবর্তী সরকারে দায়িত্ব পাননি। খলিলুর রহমানকে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যদিও তাঁর নিয়োগের সময় বিএনপির আপত্তি ছিল এবং পদত্যাগের দাবিও উঠেছিল। কিন্তু তারেক রহমানের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূসের লন্ডন বৈঠকের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। এরপর থেকে খলিলুর রহমানের সঙ্গে বিএনপির ঘনিষ্ঠতা বাড়ে বলে আলোচনা চলে। তিনি বিএনপির নেতৃত্বাধীন পরবর্তী সরকারে থাকবেন বলে কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন মহলে কথা উঠছিল। এই আলোচনার মধ্যেই নতুন সরকারে তাঁকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। 

নতুন মন্ত্রিসভায় ২৫ জনকে পূর্ণ মন্ত্রী এবং ২৪ জনকে প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে। রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁদের দায়িত্ব বণ্টনের আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। তবে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্ত্রণালয়ের নামসহ এটি প্রচারিত হচ্ছে। 

মন্ত্রিসভার তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২৫ জন পূর্ণ মন্ত্রীর মধ্যে ৯ জন অতীতে মন্ত্রী ছিলেন, অর্থাৎ তাঁদের সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ৯ জন প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েই মন্ত্রী হয়েছেন। বাকি সাতজন অতীতে সংসদ সদস্য ছিলেন, কিন্তু মন্ত্রী হননি। ২৪ জন প্রতিমন্ত্রীর সবাই প্রথমবার এ দায়িত্ব পেয়েছেন। এর মধ্যে ২১ জন প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েই প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। একজন টেকনোক্র্যাট, এবং বাকি দুজন অতীতে সংসদ সদস্য ছিলেন। 

নতুন মুখের ভিড়ে তারেক রহমান নিজেও প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। নতুন মন্ত্রীদের মধ্যে রয়েছেন এ জেড এম জাহিদ হোসেন, খলিলুর রহমান (টেকনোক্র্যাট), আবদুল আওয়াল মিন্টু, মিজানুর রহমান (মিনু), খন্দকার আবদুল মোকতাদির, আরিফুল হক চৌধুরী, জহির উদ্দিন স্বপন, মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ (টেকনোক্র্যাট), আফরোজা খানম (রিতা), শহীদ উদ্দীন চৌধুরী (এ্যানি), মো. আসাদুজ্জামান, জাকারিয়া তাহের (সুমন), দীপেন দেওয়ান, ফকির মাহবুব আনাম (স্বপন), সরদার সাখাওয়াত হোসেন (বকুল) এবং শেখ রবিউল আলম। 

তবে কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ ও নিতাই রায় চৌধুরী এরশাদ সরকারের সময় এবং আ ন ম এহসানুল হক মিলন ও আসাদুল হাবীব (দুলু) বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী ছিলেন। 

এদের মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এ জেড এম জাহিদ হোসেন, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আওয়াল মিন্টু, যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এবং সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানের মন্ত্রী হওয়ার বিষয়টি আগেই আলোচিত ছিল। জহির উদ্দিন স্বপন বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ছিলেন এবং তাঁর নেতৃত্বে এটি অল্প সময়ে জনপ্রিয় ডিজিটাল প্রচারমাধ্যমে পরিণত হয়। তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। 

বিএনপির কুমিল্লা দক্ষিণের নেতা আমিন উর রশীদ সদর আসনের জন্য উপযুক্ত প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু তাঁর পরিবর্তে মনিরুল হক চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। আমিন উর রশীদ বিক্ষোভ করলেও বিদ্রোহ করেননি। প্রতিদান হিসেবে তাঁকে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী করা হয়েছে বলে আলোচনা চলে। ব্যবসায়ী জাকারিয়া তাহেরও কুমিল্লার নেতা। 

নতুন মন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন একসময় বিএনপিতে সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং দল থেকে বহিষ্কৃতও হয়েছিলেন। এবার তাঁকে মন্ত্রিসভায় রাখা হয়েছে। ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্য শেখ রবিউল আলমকে মন্ত্রী করা হয়েছে এবং তাঁকে সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথসহ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে আলোচনা উঠেছে। 

প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, অনিন্দ্য ইসলাম (অমিত), মো. শরিফুল আলম, শামা ওবায়েদ ইসলাম, সুলতান সালাউদ্দিন (টুকু), কায়সার কামাল, ফরহাদ হোসেন আজাদ, আমিনুল হক (টেকনোক্র্যাট), মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, হাবিবুর রশীদ, মো. রাজিব আহসান, মো. আবদুল বারী, মীর শাহে আলম, জোনায়েদ সাকি, ইশরাক হোসেন, ফারজানা শারমিন, শেখ ফরিদুল ইসলাম, নুরুল হক, ইয়াসের খান চৌধুরী, ইকবাল হোসেইন, এম এ মুহিত, আহমেদ সোহেল মঞ্জুর, ববি হাজ্জাজ এবং আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম। 

বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ রশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং কেন্দ্রীয় সদস্য আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম অতীতে সংসদ সদস্য ছিলেন। টেকনোক্র্যাট প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্রীড়া সম্পাদক এবং জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক, যিনি ঢাকা-১৬ আসনে নির্বাচনে হেরে যান। 

বাকি ২১ জন প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, গণ-অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক এবং ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টের (এনডিএম) ববি হাজ্জাজ রয়েছেন। যদিও ববি হাজ্জাজ নিজের দল ত্যাগ করে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য হন। 

বিএনপির বিভিন্ন স্তরে কথা বলে জানা যায়, প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে অন্তত আটজনের বিষয়ে আগে থেকে দলীয় আলোচনা ছিল। তাঁরা হলেন বিএনপির প্রয়াত নেতা তরিকুল ইসলামের ছেলে অনিন্দ্য ইসলাম, সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাক হোসেন, প্রয়াত ওবায়দুর রহমানের মেয়ে শামা ওবায়েদ, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছিরউদ্দিনের ছেলে মীর হেলাল উদ্দিন, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ছোট ভাই সুলতান সালাউদ্দিন, প্রয়াত প্রতিমন্ত্রী ফজলুর রহমানের (পটল) মেয়ে ফারজানা শারমিন এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কায়সার কামাল। 

এ ছাড়া আলম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফুল আলম (‘পঁচা’ সাবানের মালিক) মন্ত্রী হচ্ছেন বলে শুরু থেকে আলোচনা ছিল। তবে ছাত্রদলের সাবেক দুই শীর্ষ নেতা হাবিবুর রশীদ ও রাজিব আহসান, বগুড়ার শিবগঞ্জের সংসদ সদস্য মীর শাহে আলম, ময়মনসিংহ-৩ আসনের এম ইকবাল হোসেইন, সাবেক আমলা মো. আবদুল বারীসহ আরও কয়েকজনের মন্ত্রিত্ব নিয়ে আগে তেমন আলোচনা ছিল না। 

সর্বশেষ ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার পর ২০ বছর পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। এবারের মন্ত্রিসভায় অনেক নতুন মুখ রয়েছে, যাঁরা প্রথমবার নির্বাচিত হয়েই মন্ত্রিসভায় জায়গা করে নিয়েছেন। 

এবারের মন্ত্রিপরিষদের শপথ অনুষ্ঠান ছিল ব্যতিক্রমী। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজার উন্মুক্ত স্থানে এটি অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং অসংখ্য মানুষ এটি দেখেছেন। তাঁদের একজন মানিকগঞ্জের শরিফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা আজ খুব আনন্দিত, বিএনপি সরকার শপথ নিচ্ছে। আমাদের নেতা তারেক রহমান বাংলাদেশকে অনেক এগিয়ে নেবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।’ 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন-পুরোনোর সমন্বয়ে গঠিত এই মন্ত্রিসভা ভালো করুক—এটাই সবার প্রত্যাশা। তবে অভিজ্ঞ ও নতুন মুখের এই মিশ্রণ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে দায়িত্ব বণ্টন, নীতি নির্ধারণ এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নের ওপর। 

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on print

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আরও পড়ুন