রাজনৈতিক দল হিসেবে নিষিদ্ধ, সভাপতির মাথায় মৃত্যুদণ্ডের রায়, শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশ পলাতক বা কারাগারে—এমন সমীকরণে আওয়ামী লীগ এখন রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন মোড়ে। দলের ভেতরে-বাইরে একটাই প্রশ্ন: আওয়ামী লীগ আর ফিরবে কি? কোন পথে?
গত দেড় বছরে যা জানা গেল, তাতে তিনটি পথের কথা উঠছে। কিন্তু দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এখনও কোনোটিতেই হাঁটতে রাজি নন।
পথ ১: আরেকটা গণ-অভ্যুত্থান – প্রায় অসম্ভব
পলাতক নেতাদের একাংশ এখনো স্বপ্ন দেখেন, যেভাবে ৫ আগস্ট পালিয়েছেন, সেভাবেই একদিন ‘প্রত্যাবর্তন’ হবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন:
- দলীয় প্রধানসহ কেন্দ্রীয় নেতারা বিদেশে
- দেশে যারা ছিলেন, তাদের প্রায় সবাই কারাগারে বা আত্মগোপনে
- তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মাঠে নামানোর টাকা-পয়সা নিয়েও কলকাতা-দিল্লি-লন্ডনের নেতাদের মধ্যে ঝগড়া
- ছাত্রলীগ ছাড়া কেউ প্রকাশ্যে মিছিল করতে পারছে না
দলেরই নেতারা বলছেন, “এখন গণ-অভ্যুত্থান করা অসম্ভব।”
পথ ২: ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া – এখনো ‘অসম্ভব’ মনে করছেন হাসিনা
দলের ভেতরে ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ বা ‘পরিশুদ্ধ আওয়ামী লীগ’ গঠনের আলোচনা আছে। বিদেশি শুভাকাঙ্ক্ষীরাও এই পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু নেতাদের ভাষ্য:
“ভুল স্বীকার করলে জুলাইয়ে ১৪০০+ হত্যার দায় স্বীকার করা হয়ে যায়। এটা আমরা করব না।”
সম্প্রতি নিউজ১৮-এ শেখ হাসিনা বলেছেন, তাঁর পতনে ‘যুক্তরাষ্ট্র সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল না’—একে কেউ কেউ ‘ভুল স্বীকারের প্রথম ধাপ’ বলে দেখছেন। কিন্তু দলের ভেতরে এখনো সেই বার্তা পৌঁছায়নি।
পথ ৩: নেতৃত্ব বদল + সময়ের অপেক্ষা – সবচেয়ে বাস্তবসম্মত, কিন্তু হাসিনা রাজি নন
ভেতরে আলোচনা আছে:
- শেখ হাসিনা সরে দাঁড়াবেন
- পরিবারের অন্য সদস্য (জয়? পুতুল?) নেতৃত্বে আসবেন
- বিতর্কিত সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের সরিয়ে নতুন মুখ আনা হবে
কিন্তু হাসিনার অবস্থান: “খারাপ সময় বিতর্কিত নেতাদের দিয়েই পার করতে চান।” ফলে এই পথও এখন বন্ধ।
আরেকটা বাস্তবতা: কেউ সহানুভূতি দেখাবে না
- জুলাইয়ে নিহত-আহতদের পরিবার ক্ষমা করবে না
- বিএনপি-জামায়াত ১৫ বছরের নির্যাতনের প্রতিশোধ ভুলবে না
- এনসিপিসহ অভ্যুত্থানের তরুণরা আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন চায় না
- অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগকে ‘শত্রু’ মনে করে
একজন কেন্দ্রীয় নেতা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক):
“অন্তর্বর্তী সরকারকে আমরা একেবারে শত্রু মনে করি। অন্য কেউ ক্ষমতায় এলে অন্তত জামিন পাওয়া সহজ হতো।”
ভারতের ওপর ভরসা কমছে, তবু আশা ছাড়েননি
৫ আগস্ট থেকে ভারতে আশ্রয় নেওয়া নেতারা প্রথমে ভেবেছিলেন দিল্লি তাদের ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু মোদি সরকারের নীরবতা আর ট্রাম্পের নির্বাচনের পরও কোনো সিগন্যাল না আসায় আশায় ভাটা পড়েছে। তবু অনেকে এখনো বলেন: “ভারত আমাদের ছেড়ে দেবে না।”
বিশ্লেষকদের মত: ফেব্রুয়ারির পর নতুন সরকারই নির্ধারণ করবে
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান:
“ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর যে সরকার আসবে, তাদের আচরণের ওপর আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। এখন তাদের অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছু করার নেই।”
সারকথা: আওয়ামী লীগ এখন যে তিন পথের কথা ভাবছে, তার দুটোই প্রায় বন্ধ। তৃতীয় পথ—ভুল স্বীকার ও নেতৃত্ব বদল—এখনো হাসিনা মানতে রাজি নন। ফলে ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনের পর যে সরকার আসবে, তার দয়া-দাক্ষিণ্যেই আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। আর সেই সরকার যদি বিএনপি-জামায়াত বা অভ্যুত্থানের তরুণদের হয়, তাহলে আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ প্রত্যাবর্তন অনেক দূরের স্বপ্ন হয়ে থাকবে।