গত বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকার রায়েরবাজারে শহীদ বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের ডাকসু নির্বাচনে বিজয়ী নেতারা দোয়া ও মোনাজাত করেছেন, যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর জামায়াত-সমর্থিত কোনো সংগঠনের এই স্মৃতিসৌধে প্রথম সফর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই ঘটনাকে বিশ্লেষকরা জামায়াতের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ঐতিহাসিক অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। দলীয় সূত্র জানায়, ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ আরও বাড়তে পারে, যা জামায়াত এতদিন এড়িয়ে এসেছে।
জামায়াতের একজন দায়িত্বশীল নেতা প্রথম আলোকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার জন্য ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে দলের মধ্যে ইতিবাচক আলোচনা চলছে, তবে কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের কারণে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। শীর্ষ নেতৃত্ব উপযুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ ও সময়ের বিষয়টি বিবেচনা করছে। এর আগে, জামায়াতের সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কামারুজ্জামান, ২০১৫ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত, ২০১০ সালে কারাগার থেকে দলীয় সংস্কারের জন্য চিঠি লিখেছিলেন। রাজ্জাক ২০১৯ সালে দলের নিষ্ক্রিয়তার প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন এবং ২০২৫ সালের ৪ মে লন্ডনে মারা যান।
রাজ্জাক তাঁর পদত্যাগপত্রে লিখেছিলেন, “অতীতে আমি বহুবার পদত্যাগের কথা ভেবেছি, কিন্তু এই আশায় নিজেকে বিরত রেখেছি যে অভ্যন্তরীণ সংস্কার ও ’৭১-এর ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে একটি ঐতিহাসিক অর্জন সম্ভব হবে। কিন্তু ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে জামায়াতের পদক্ষেপ আমাকে হতাশ করেছে।” তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর দলকে মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকার দায় স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ার এবং নতুন নামে দল পুনর্গঠনের পরামর্শ দিয়েছিলেন। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের পর জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ মুক্তিযুদ্ধের ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া ও সমাজসেবামূলক দল হিসেবে পুনর্গঠনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলেও মজলিশে শুরা তা অনুমোদন করেনি।
কামারুজ্জামান ২০১০ সালে ‘পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে নতুন কর্মকৌশল গ্রহণ’ শীর্ষক চিঠিতে দলের ৬০ বছরের সংগ্রামের বিশ্লেষণ করে নতুন প্রজন্মের হাতে নেতৃত্ব হস্তান্তরের পরামর্শ দেন। তিনি দলের পরিস্থিতিকে ‘নাজুক’ ও ‘কঠিন চ্যালেঞ্জ’ উল্লেখ করে বলেন, “যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তরা নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়াবেন এবং নতুন প্রজন্মের হাতে জামায়াত হস্তান্তর করবেন।” ২০১০ সালে গ্রেপ্তার, ২০১৩ সালে ফাঁসির আদেশ এবং ২০১৫ সালে তাঁর ফাঁসি কার্যকর হয়। ২০২০ সালে জামায়াতের সংস্কারে ব্যর্থতায় ক্ষুব্ধ হয়ে মজলিশে শুরার সদস্য মজিবুর রহমান মঞ্জু ‘আমার বাংলাদেশ পার্টি’ গঠন করেন।
জামায়াতের নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় জানা গেছে, শুধু মুক্তিযুদ্ধের বিষয় নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও পুরোনো নীতি শিথিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে শুধু শপথধারী ‘রুকন’ সদস্যদের মনোনয়ন দেওয়ার নিয়ম শিথিল করে নৈতিকতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ ব্যক্তি, এমনকি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদেরও মনোনয়ন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। একজন কেন্দ্রীয় নেতা জানান, দল ক্রমাগত সংস্কারের পথে এগোচ্ছে।
ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের বিজয়ের পর নতুন পদক্ষেপ দেখা গেছে। ঐতিহ্যগতভাবে ছাত্রশিবির ও ইসলামী ছাত্রী সংস্থা পৃথকভাবে কাজ করে, ধর্মীয় ও নৈতিক কারণে তাদের মধ্যে যোগাযোগ সীমিত ছিল। এবার ছাত্রী সংস্থার নেত্রীদের ছাত্রশিবির প্রার্থীদের সঙ্গে প্রচারে সমন্বয়ের সুযোগ দেওয়া হয়। এই ছাড় মো. আবু সাদিক কায়েম (ভিপি) ও এস এম ফরহাদের (জিএস) অনুরোধে এবং ধর্মীয় নীতি মেনে দেওয়া হয়।
জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, “স্বাধীনতাযুদ্ধ ও বাংলাদেশ গঠনে অবদানকারীদের আমরা সম্মান করি এবং তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ।” ১১ সেপ্টেম্বর সকালে সাদিক কায়েমের নেতৃত্বে বিজয়ী প্রার্থীরা ১৯৭১-এর শহীদ, জুলাই বিপ্লবের শহীদ ও নবাব সলিমুল্লাহর কবর জিয়ারত করে দোয়া করেন। সাদিক কায়েম বলেন, “শহীদদের ত্যাগের কারণেই আমাদের স্বাধীনতা, তাই তাঁদের স্মরণ আমাদের প্রথম দায়িত্ব।” ১৯৭৭ সালে ছাত্রশিবির প্রতিষ্ঠার পর এটিই তাদের রায়েরবাজারে প্রথম সফর।