মার্কিন প্রশাসন বাংলাদেশসহ কিছু দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে। ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই চূড়ান্তভাবে বাংলাদেশকে ২০ শতাংশ শুল্কহার দেয়া হয়েছে, যা আগের ঘোষিত ৩৭ শতাংশ বা ৩৫ শতাংশের থেকে কম। এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ আপাতত কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে, তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে বাংলাদেশ এই অবস্থায় কতটা লাভবান বা ক্ষতিগ্রস্ত হল।
মার্কিন শুল্ক হার ও দেশভিত্তিক বণ্টন
যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক কার্যক্রমে মোট ৬৬টি দেশ ও ৩টি অঞ্চল (যেমন ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দুটি আলাদা বিভাগ) অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। দেশগুলোকে বিভিন্ন হারভিত্তিক শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে:
- ১০ শতাংশ শুল্ক: ব্রাজিল, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ, যুক্তরাজ্যসহ কিছু দেশ। তালিকায় না থাকা দেশগুলোর ওপরও ১০ শতাংশ শুল্ক ধার্য করা হয়েছে, কারণ তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ন্যায্য বাণিজ্য সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
- ১৫ শতাংশ শুল্ক: সর্বোচ্চ সংখ্যক দেশ, মোট ৩৯টি দেশ, যেমন আফগানিস্তান, জাপান, ইসরায়েল, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
- ১৮ শতাংশ শুল্ক: কেবল নিকারাগুয়া।
- ১৯ শতাংশ শুল্ক: পাকিস্তান, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ডসহ ৬টি দেশ।
- ২০ শতাংশ শুল্ক: বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম।
- ২৫ শতাংশ শুল্ক: ভারত, ব্রুনেই, কাজাখস্তানসহ ৫টি দেশ।
- ৩০ শতাংশ শুল্ক: আলজেরিয়া, লিবিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা।
- ৩৫ শতাংশ শুল্ক: ইরাক, সার্বিয়া।
- ৪০ শতাংশ শুল্ক: মিয়ানমার, লাওস।
- ৪১ শতাংশ শুল্ক: সিরিয়া।
বাংলাদেশের অবস্থান এবং প্রভাব
২০২৪ সালে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৮৪৪ কোটি ডলার, যার ওপর মোট ১২৭ কোটি ডলার শুল্ক আদায় করা হয়েছে। নতুন শুল্ক কার্যকর হলে গড় শুল্কহার ১৫.৬০ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০ শতাংশের বেশি হবে। পোশাক খাতে এই বৃদ্ধি বিশেষ প্রভাব ফেলবে, যেখানে শুল্ক ১৬.৭৭ থেকে ৩৬.৭৭ শতাংশে উঠবে। অন্যান্য পণ্যের শুল্কহারও প্রায় দ্বিগুণ হবে।
শুল্কের পেছনের যুক্তি
যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউস জানায়, শুল্কহার নির্ধারণের ক্ষেত্রে মূলত ‘পারস্পরিকতা’ নীতি এবং বাণিজ্যঘাটতির মাপকাঠি বিবেচিত হয়েছে। অর্থাৎ যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করে, তাদের পণ্যের ওপরও সমপর্যায়ের শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
তিন শ্রেণিতে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে:
১) যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইতোমধ্যে বা আলোচনাধীন অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা চুক্তিতে আছে (যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান),
২) যারা আলোচনা করেছে কিন্তু প্রস্তাব পর্যাপ্ত নয় (বাংলাদেশ এই শ্রেণিতে পড়েছে),
৩) যারা একেবারেই আলোচনা করেনি (যেমন সিরিয়া, মিয়ানমার)।
বাংলাদেশের স্বস্তির কারণ
বাংলাদেশের ২০ শতাংশ শুল্ক হার অন্য প্রতিযোগী দেশের (যেমন পাকিস্তান ১৯%, শ্রীলঙ্কা ২০%, ভারত ২৫%) তুলনায় মোটামুটি গ্রহণযোগ্য। বিশেষ করে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান বিবেচনায় এই হার আপাতত একটা ধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে।
ভবিষ্যৎ করণীয় ও বিনিময়
বাংলাদেশকেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা চুক্তি করতে হবে। ইন্দোনেশিয়া ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে ইতোমধ্যে এমন চুক্তি হয়েছে, যেখানে শুল্ক কমানো ছাড়াও শ্রম অধিকার, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও অন্যান্য খাতে সহযোগিতা নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই চুক্তির খসড়া প্রস্তুত থাকলেও আনুষ্ঠানিকতা এবং কিছু বিষয় গোপন থাকায় পুরো ছবি স্পষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতিও আছে
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই শুল্ককাঠামো যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের জন্য মূল্যবৃদ্ধি ও ক্ষতির কারণ হবে। পোশাক ও জুতার দাম বাড়ার কারণে আমেরিকান পরিবারগুলো অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবিত হবে। দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি কমতে পারে, বেকারত্ব বাড়তে পারে, এবং চাকরির বাজার সংকুচিত হতে পারে। তবে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে।
সারসংক্ষেপ
- বাংলাদেশ ২০ শতাংশ শুল্ক হার পেয়ে আপাতত স্বস্তি পেয়েছে।
- বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করতে বাধ্য থাকবে, যেখানে শর্তসমূহে বিভিন্ন খাতের উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ থাকতে পারে।
- মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতামূলক অবস্থায় থাকবে কারণ অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বীদেরও উচ্চ শুল্ক পড়েছে।
- যুক্তরাষ্ট্রেও শুল্কের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, যা ভবিষ্যতে এই নীতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
- বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হলো, রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো ও একক মার্কিন বাজারে নির্ভরতা কমানো প্রয়োজন।