ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ থাকবে বলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দিয়েছে। হলগুলোতে কোনো ধরনের প্রকাশ্য বা গোপন রাজনীতি করা যাবে না। এই ঘোষণার পর ছাত্রনেতাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
আগামী ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন রয়েছে এবং ইতোমধ্যেই বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও শিক্ষার্থীরা নির্বাচনী প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। এই প্রেক্ষাপটে আবাসিক হলে ছাত্ররাজনীতির অবস্থা নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
গত শুক্রবার গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আবাসিক হলে রাজনীতি নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেয়। যদিও পরদিন সরকারি কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য না আসলেও, দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত হল প্রভোস্ট ও বিভিন্ন অংশগ্রহণকারীর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বৈঠক চলে। প্রাক্টর সাইফুদ্দীন আহমেদ জানিয়েছেন, রোববার বিকেলে ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা হবে।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল শুক্রবার ১৮টি আবাসিক হলের জন্য আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে। এর পর রাতেই কিছু শিক্ষার্থী হলগুলোতে রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে বিক্ষোভ করে। রাজু ভাস্কর্যের সামনে বিক্ষোভ শেষে তারা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন। উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান এবং প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমেদ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এক ঘণ্টার আলাপ করেন। উপাচার্য বলেন, ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই নেওয়া হল প্রভোস্টের সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে এবং হল পর্যায়ে ছাত্ররাজনীতি নিয়ন্ত্রিত থাকবে। তবে শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধের দাবি জানান। শেষমেষ রাত তিনটায় প্রক্টর ‘প্রকাশ্য ও গুপ্ত রাজনীতি’ নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেন, যা শুনে শিক্ষার্থীরা উল্লাস করে।
এর কিছু সময় পর স্যার এ এফ রহমান হলে প্রভোস্টের অফিস থেকে প্রজ্ঞাপন আসে, যেখানে বলা হয় বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের কমিটিভুক্তরা পদত্যাগ ও মুচলেকা দিলে হলে অবস্থান করতে পারবেন, অন্যথায় বহিষ্কার করা হবে।
গত বছর ১৫ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ছাত্রলীগের হামলার পর, ১৭ জুলাই ছাত্রলীগকে হল থেকে বিতাড়িত করা হয়। তখন শিক্ষার্থীরা হল প্রাধ্যক্ষদের কাছ থেকে স্বাক্ষর নেয় যে আবাসিক হলে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ থাকবে। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই সম্প্রতি ছাত্রদলের হল কমিটি ঘোষণা হলে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
ঘোষণার পর বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন এই সিদ্ধান্তকে ‘বিরাজনীতিকরণ’ বলছেন এবং বলেন, প্রক্টর এমন সিদ্ধান্ত দিতে পারেন কি না সন্দেহ রয়েছে। তিনি সতর্ক করেছেন, হলে রাজনীতি নিষিদ্ধ হলে গুপ্ত রাজনীতি বাড়বে।
অন্যদিকে গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের আহ্বায়ক আবদুল কাদের মনে করেন, হল ও একাডেমিক এলাকায় রাজনীতি না চাওয়া শিক্ষার্থীদের দাবিই প্রকৃত। তার মতে, এর পেছনে শিক্ষার্থীদের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং এ ব্যাপারে ছাত্রসংগঠনের মধ্যেও অলিখিত সমঝোতা ছিল।
বামপন্থী ছাত্রসংগঠনের নেতারা বলেন, প্রক্টরের ঘোষণার কোনো আইনি ভিত্তি নেই এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো স্থানে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের ক্ষমতা তার নেই। বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক জাবির আহমেদ জুবেল বলেন, ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যৌথ সিদ্ধান্তের সুযোগ ছিল কিন্তু সেটা কাজে লাগানো হয়নি। তবে তিনি এখনো ঐকমত্যের সম্ভাবনা দেখছেন।
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মেঘমল্লার বসু এই সিদ্ধান্তকে অপরিণামদর্শী বলছেন এবং বলছেন, যাঁরা দিয়েছেন ও নিয়েছেন, তাঁরা ফলপ্রসূ চিন্তা করেননি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্র ফেডারেশনের সাবেক নেত্রী উমামা ফাতেমা মনে করেন, হলে রাজনৈতিক কমিটি দেওয়ার সুযোগ থাকলে পেছনের দরজা দিয়ে দখলদারি প্রবেশ করবে। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে সবার মধ্যে গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির মনে করে, আবাসিক হলে ছাত্ররাজনীতি দরকার নেই, তবে শিক্ষার্থীরা হলে না করলেও বাইরে রাজনীতি করতে পারে।
গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ, ছাত্রদল ও বাম সংগঠনের অনেক নেতা ও শিক্ষার্থী ছাত্রশিবিরের গোপন কমিটির বিষয়ে অভিযোগ করেছেন। তারা শিবিরকে প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে আহ্বান জানাচ্ছেন। গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের আবদুল কাদের বলছেন, শিবির গোপনে কার্যক্রম চালিয়ে ছাত্রদের আস্থা নষ্ট করেছে এবং হলে ছায়া প্রশাসন করেছে।
অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিরের সভাপতি এস এম ফরহাদ হলগুলোতে শিবিরের কোনো কমিটি নেই দাবি করেছেন।
ছাত্র ইউনিয়নের নেতা মেঘমল্লার বসু বলেন, হলে প্রকাশ্যে কমিটি না থাকলে গুপ্ত রাজনীতি বৃদ্ধি পাবে। প্রক্টর গুপ্ত রাজনীতি নিষিদ্ধ করছেন, কিন্তু কীভাবে তা বাস্তবায়িত হবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।
সর্বোপরি, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের এ ঘোষণা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতর্ক এবং ভিন্নমত তৈরি করেছে। এই ইস্যু নিয়ে আলোচনা ও সমঝোতা প্রয়োজন বলে সবাই মনে করছেন।