ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনায় সংগঠিত নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত পাচ্ছে পুলিশ। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কয়েক মাস ধরে পরিকল্পিতভাবে এ হামলা চালানো হয়েছে এবং উদ্দেশ্য ছিল দেশে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা। হামলার পরপরই পালানোর ছকও কার্যকর করা হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনায় জড়িত হিসেবে এ পর্যন্ত তিনজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। গুলি চালানো ‘শুটার’ হলেন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ফয়সল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল (যিনি ৫ আগস্টের পর দাউদ খান নামে পরিচয় দিতেন), মোটরসাইকেল চালক আলমগীর শেখ এবং রেকি করা রুবেল (আদাবর থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের কর্মী)। তিনজনই আওয়ামী লীগ–সংশ্লিষ্ট রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। হাদির বিভিন্ন গণসংযোগে তাদের একসঙ্গে থাকার ছবি পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, যা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
তদন্ত সূত্র মনে করছে, অন্তত দুই মাস ধরে হাদিকে অনুসরণ করা হয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন (গত শুক্রবার) হামলার মধ্য দিয়ে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করাই ছিল মূল লক্ষ্য। ওই দিন রাতে বাড্ডায় বাসে আগুন, ককটেল বিস্ফোরণ ও লক্ষ্মীপুরে নির্বাচন অফিসে অগ্নিসংযোগের মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শুটার ও চালক ভারতে পলাতক?
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, ফয়সল ও আলমগীর হামলার ১২ ঘণ্টার মধ্যে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছেন। শনিবার রাতে সীমান্তবর্তী এলাকায় অভিযান চালিয়ে মানব পাচারে জড়িত সন্দেহে সঞ্জয় চিসিম ও সিবিরন দিও নামে দুজনকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করেছেন, শুক্রবার দিবাগত রাতে দুই বাংলাদেশিকে ভারতে পাচারে সহায়তা করেছেন—যাদের ফয়সল ও আলমগীর বলে মনে করা হচ্ছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এস এন নজরুল ইসলাম রোববার সংবাদ সম্মেলনে জানান, আটকদের জিজ্ঞাসাবাদে হামলায় জড়িতদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যেতে পারে। ফয়সলের পাসপোর্ট ও ভ্রমণ ইতিহাস শনাক্ত হয়েছে; সর্বশেষ তিনি সিঙ্গাপুর ভ্রমণ করেছেন।
মোটরসাইকেল মালিক রিমান্ডে, শুটারের স্ত্রী-শ্যালক-বান্ধবী আটক
হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের মালিক মো. আব্দুল হান্নানকে গ্রেপ্তারের পর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, এক বছর আগে মোটরসাইকেলটি বিক্রি করেছেন।
সর্বশেষ গতকাল রাতে র্যাব নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকায় অভিযান চালিয়ে ফয়সলের স্ত্রী, শ্যালক ও বান্ধবীকে আটক করেছে। হামলার আগে তাদের সঙ্গে ফয়সলের একাধিক ফোনালাপের প্রমাণ পাওয়ায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
কে এই ফয়সল করিম মাসুদ?
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ফয়সল ছিলেন নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তরের সহসভাপতি। তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ছেলে জ্যোতি, সাবেক প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের এপিএস বিপ্লব ও আলোচিত সন্ত্রাসী আসিফ আহমেদের সঙ্গে।
গত বছর অস্ত্র ও লুটের মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর হাইকোর্ট থেকে জামিন পান ফয়সল। তদন্তে দেখা গেছে, তিনি আইটি ব্যবসায়ীর পরিচয়ে বিদেশ ভ্রমণ করতেন।
এ ঘটনা নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ানোর চেষ্টা বলে মনে করা হচ্ছে। তদন্ত চলমান, জড়িতদের ধরতে অভিযান অব্যাহত।