জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তিতে আয়োজিত একটি গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মতামত ব্যক্ত করেছেন। এতে বলা হয়, এক বছরে ভালো অভিজ্ঞতার চেয়ে খারাপ অভিজ্ঞতাই বেশি হয়েছে, এবং অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে সক্ষমতার অভাব স্পষ্টতই লক্ষণীয়। এক পক্ষের দাবি, দেশের শাসনে ‘সরকারের ভেতর আরেকটা সরকার’ রয়েছে, যা প্রকৃত সরকারের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে।
বৈঠক শুরুতে রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনায় হতাহতদের প্রতি শোক জানানো হয়। কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার বলেন, “গণ-অভ্যুত্থানই মূল পথ, নির্বাচন নয়”। তিনি নির্বাচনকে পুরনো মাফিয়া শাসন ফেরত আনার হাতিয়ার হিসেবে দেখেন এবং মনে করেন, দেশকে নতুন দিক দিয়ে গড়ে তুলতে বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাবিদদের ঐক্য জরুরি।
গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য আনু মুহাম্মদ বলেন, “জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার তার উল্টো পথযাত্রা করছে”। তিনি ধর্ম, জাতি ও শ্রেণি ভিত্তিক বৈষম্যবিরোধী রাজনীতির চর্চা বাড়ার কথা উল্লেখ করেন।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, “বিচার, সংস্কার, নির্বাচন—এই তিন বিষয় নিয়ে এক বছরের পাওনার হিসাব জরুরি”। তিনি সাধারণ মানুষকে রাজনৈতিক গণনায় ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তা ও সরকারের দক্ষতার অভাবের কথাও উল্লেখ করেন।
সিপিডির ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “সরকারের মধ্যে একটি অদৃশ্য আরেকটি সরকার রয়েছে, যা দলের নিরপেক্ষতার প্রশ্নকে জটিল করে তুলেছে”। তিনি নির্বাচন সফল করতে সেনাবাহিনীর সহযোগিতার গুরুত্বেও জোর দেন।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন উল্লেখ করেন, “বিচার বিভাগে ভয় ও অনাস্থার পরিবেশ বিরাজ করছে”, যা সুষ্ঠু বিচার প্রক্রিয়ার জন্য বড় বাধা।
গবেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, গত এক বছরে সরকারে দক্ষতার অভাব ও দক্ষিণপন্থী মতাদর্শের উত্থান লক্ষ্যণীয়। তবে তিনি তরুণ প্রজন্মের রাজনীতিতে আগ্রহ বাড়াকে ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখেন।
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য সাঈদ ফেরদৌস মন্তব্য করেন, “রাজনৈতিক দলগুলো নতুন পথ অনুসরণ করছে না, বরং পুরনো কায়দায় নিজেদের শক্তি ধরে রাখার চেষ্টা করছে”।
গণ-অভ্যুত্থানের শ্রমজীবী অংশগ্রহণ ও তাদের প্রতি সরকারী আচরণ নিয়ে উন্নয়ন অর্থনীতিবিষয়ক গবেষক মাহা মির্জা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “অভ্যুত্থানে নিহত শ্রমিকদের প্রতি সঠিক সম্মান ও ন্যায্যতা দেয়া হয়নি”।
সবশেষে রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান বলেন, “দেশের সমস্যার সমাধান এখন শুধু নির্বাচনে; বিলম্ব বা নির্বাচন ঠেকানোলে দেশের পরিস্থিতি আরো বিপর্যস্ত হবে”।
মোট মিলিয়ে, এক বছরে অর্জিত অল্প কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরকারের অক্ষমতার কারণে দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে—এবং দ্রুত ও সুষ্ঠু নির্বাচনই একমাত্র সমাধান।