শনিবার ২ মে, ২০২৬
সর্বশেষ:
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে প্রক্রিয়া নির্ধারণে সংসদে মুলতবি প্রস্তাব   মৃত্যুর মিছিলেও নীরবতা—আর কত গেলে জাগবে অস্বস্তি?   “দুর্নীতির জালে বন্দী গ্রামীণ সড়ক” সংসদে ফখরুলের তোপ   সংবিধান সংস্কার পরিষদ ইস্যুতে সংসদে তুমুল বিতর্ক, হট্টগোল   কোল্ড স্টোরেজে ভয়াবহ আগুন চট্টগ্রামে, নিয়ন্ত্রণে ছয় ইউনিট   মাসুদ–খালেদকে ‘দুষ্কৃতকারী’ আখ্যা চিফ প্রসিকিউটরের   স্বাধীনতার সূচনা নিয়ে অলি আহমদের মন্তব্যে তোলপাড়   “এটি আমার নৈতিক দায়িত্ব”—স্মৃতিসৌধে বিরোধীদলীয় নেতা   কড়া হুঁশিয়ারি ফখরুলের: “রাডার দিয়ে নজর রাখছি”  স্বাধীনতা দিবসকে ঘিরে জামায়াতের ২ দিনের কর্মসূচি প্রকাশ 

রাজনীতির হটস্পট পল্টন: তিন ভবনেই ১৫ দলের কার্যালয় 

সেপ্টেম্বর 16, 2025
রাজনীতির হটস্পট পল্টন: তিন ভবনেই ১৫ দলের কার্যালয় 

রাজধানীর পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোড ধরে সামান্য এগোলে ১৬ তলা জামান টাওয়ার চোখে পড়ে। গত ১১ আগস্ট ও ১৪ সেপ্টেম্বর ভবনের ছাদ পরিদর্শনে দেখা গেছে, সেখানে তিনটি কক্ষে তিনটি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়—ন্যাশনাল লেবার পার্টি, জনতার অধিকার পার্টি (পিআরপি) এবং দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও আন্দোলন—স্থাপিত হয়েছে। এছাড়া জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)-এর মহানগর কার্যালয়ও ছাদে অবস্থিত। ভবনের ষষ্ঠ তলায় আমজনতার দলের কার্যালয় রয়েছে। দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও আন্দোলন ও আমজনতার দল ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গঠিত হয়, আর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ফলে জন্ম নেওয়া ইউনাইটেড বাংলাদেশ (আপ বাংলাদেশ) এর কার্যালয়ও ছাদে অবস্থান করছে। 

জামান টাওয়ারসসহ পল্টন ও আশপাশের তিনটি ভবনে তদন্তে দেখা গেছে, এসব স্থানে ১৪টি দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং একটি দলের মহানগর কার্যালয় রয়েছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) তথ্য অনুসারে, দেশে নিবন্ধিত ৫০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ২৭টির কার্যালয় পল্টন, তোপখানা রোড, কাকরাইল, গুলিস্তান, বিজয়নগর, সেগুনবাগিচা ও মতিঝিলে অবস্থিত। এছাড়া আরও ১৬টি নিবন্ধনহীন দলের কার্যালয় এসব এলাকায় রয়েছে। পল্টন প্রায় রাজনীতির ‘রাজধানী’ হয়ে উঠেছে, যার প্রান্তবর্তী এলাকা হলো তোপখানা রোড, কাকরাইল, গুলিস্তান, বিজয়নগর, সেগুনবাগিচা ও মতিঝিল। 

পল্টনের ইতিহাসে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ঢাকা পুরান ঢাকা ছাড়িয়ে বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই এলাকায় বসতি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল। বাংলাপিডিয়া অনুসারে, পল্টনের আয়তন ১.৪২ বর্গকিলোমিটার। মুনতাসীর মামুনের বই ‘ঢাকা: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী’তে উল্লেখ আছে, পুরানা পল্টন, নয়াপল্টন, তোপখানা থেকে ফুলবাড়িয়া রেললাইন অবধি একসময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনানিবাস ছিল। ১৮৪০ থেকে সেনানিবাস সরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়, আর উনিশ শতকের মধ্যভাগে এখানে ক্রিকেট ও জনসভা অনুষ্ঠিত হতো। তৃতীয় দশক পর্যন্ত লোকবসতি কম ছিল, আর চল্লিশের দশক পর্যন্ত পল্টন ময়দান ফাঁকা ছিল। পরে এটি রাজনৈতিক সভার কেন্দ্র হয়ে ওঠে—১৯৫৩-এ মহিলা সমাবেশ, ১৯৫৪-এ যুক্তফ্রন্টের জয়জাগরণ, ষাটের দশকে গণ-আন্দোলনের ভূমিকা। 

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না প্রথম আলোকে বলেন, পল্টনের রাজনৈতিক ঐতিহ্যের কারণেই দলগুলো এখানে কার্যালয় স্থাপন করেছে। দলগুলোর প্রথম যুগে গুলিস্তান প্রাণকেন্দ্র ছিল; তাই আওয়ামী লীগ (বর্তমানে নিষিদ্ধ) বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে, বিএনপি নয়াপল্টনে কার্যালয় নিয়ে আসে। জামান টাওয়ারে ভাড়া বেশি—প্রতি বর্গফুট ৮০-১২০ টাকা—তাই ছোট দলগুলো ছাদে স্থান নিয়েছে। ছাদে পুরোনো জিনিস, শেওলা-মোটা প্রাচীর, পলেস্তারহীন দেয়াল সত্ত্বেও সাতটি কক্ষ রয়েছে। প্রথম কক্ষে লেবার পার্টি ও জাগপা সমঝোতায় ছিল, কিন্তু ১৪ সেপ্টেম্বরে জাগপার নাম মুছে ফেলা হয়েছে। জাগপা সহসভাপতি রাশেদ প্রধান বলেন, ভাড়াটে কক্ষের অভাবে মালিকের সহায়তায় কার্যালয় হয়েছিল, তবে দেয়াললিখন মুছে ফেলার বিষয় তিনি অজানা। 

পাশের কক্ষে পিআরপি-এর কার্যালয়, ২০২২ থেকে ভাড়া নিয়ে চলছে; বিএনপি-সম্পর্কিত জোট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে গত বছর। লেবার ও পিআরপির মাঝে একটি পথে দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও আন্দোলনের কার্যালয়, যেখানে গত আগস্টে কেউ পাওয়া যায়নি। শেষ চার কক্ষে আপ বাংলাদেশ, পল্টন থানা বিএনপি নেতার কার্যালয়, মালিকের ব্যবহার ও ফাঁকা কক্ষ রয়েছে। মালিক মিয়া মশিউজ্জামান বলেন, এ তাঁর পারিবারিক বাড়ি, আগে তিনতলা ছিল; রাজনৈতিক উৎসাহে কক্ষ ভাড়া দেওয়া হয়েছে। 

প্রেসক্লাবের বিপরীতে শিশুকল্যাণ ভবনে সাত দল—জাসদ, নাগরিক ঐক্য, জাতীয় গণফ্রন্ট, পল্লী উন্নয়ন পার্টি, সিএপিপি, সিপিবি (এম), বাসদ (মার্ক্সবাদী)—কার্যালয় রয়েছে। নয়াপল্টন মসজিদ গলিতে তিন দল—লেবার পার্টি, প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী, জন-অধিকার পার্টি—বিএনপি-সম্পর্কিত, নিবন্ধনহীন; গত মাসে তারেক রহমানের বৈঠকে অংশগ্রহণ করেছে। লেবার পার্টির কার্যালয় বন্ধ, প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদীর ফিরোজ লিটন বলেন জুলাই অভ্যুত্থানের পর কার্যালয় নেওয়া হয়েছে। জন-অধিকার পার্টির কার্যালয়ও বন্ধ, চেয়ারম্যান ইসমাইল সম্রাট জানান ৪৭ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি ও জেলা-উপজেলা অফিস রয়েছে। 

বিএনপির কার্যালয়ও নয়াপল্টনে; জিয়াউর রহমান ১৯৭৮-এ জাগদল থেকে বিএনপি গঠন করেন, প্রথমে ধানমন্ডি, পরে নয়াপল্টনে স্থানান্তর। জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয় মগবাজারে, কিন্তু পল্টনে মহানগর কার্যালয়; কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে গত বছর হামলা ও আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটেছে, যা গণ অধিকার পরিষদ অস্বীকার করেছে। ইসলামপন্থী দল ইসলামী আন্দোলনের কার্যালয় পল্টনে; গাজী আতাউর রহমান বলেন, পল্টনের ময়দান ও বায়তুল মোকাররমের কাছাকাছি প্রেসক্লাবের কারণে ইসলামপন্থী দলগুলো এখানে কার্যালয় নিয়েছে। 

দেশে নতুন দল গঠন বাড়ছে; জুনে ১৪৭টি দল নিবন্ধনের আবেদন করেছে, বেশিরভাগ নামমাত্র। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ছোট দলগুলো বড় দলের পুঁজি ছাড়াই ‘ওয়ান ম্যান শো’ হয়ে ওঠে, বড় দল জোটে রাখে আসন বা ঠিকাদারি দেয়। এটি পারস্পরিক সুবিধার কৌশল। 

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on print

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আরও পড়ুন