বাংলাদেশের বর্তমান খণ্ডিত ও বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে উচ্চমধ্যম আয় বা উন্নত দেশের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিকেরা। শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকার ঘোষণা করে ধাপে ধাপে পুরো শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনের জন্য ৫ থেকে ১০ বছরের একটি সমন্বিত রোডম্যাপ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
মঙ্গলবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত ‘শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ও জাতীয় উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রাক্-বাজেট সংলাপে এ মতামত উঠে আসে। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে এম ওয়ারেসুল করিম। তিনি বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বড় কলেজগুলোর মানোন্নয়নে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্মার্ট ক্লাসরুম, আধুনিক ল্যাব ও পাঠাগার স্থাপন এবং শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধির ওপর জোর দেন তিনি। তাঁর মতে, সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত প্রাথমিক শিক্ষায়।
প্রবন্ধে বলা হয়, দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক, মাদ্রাসা, কারিগরি ও কলেজভিত্তিক শিক্ষা কাঠামোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে, যা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। এই জটিলতা দূর করতে ধাপে ধাপে শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠনের আহ্বান জানানো হয়।
এ জন্য প্রথমে কয়েকটি জেলায় পরীক্ষামূলক সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে পরে তা সারা দেশে বিস্তারের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
সংস্কার প্রক্রিয়ায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- কোনো শিশুর শিক্ষা বন্ধ না হওয়া
- মাদ্রাসা শিক্ষার মানোন্নয়ন
- সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে জাতীয় মানদণ্ডের আওতায় আনা
- পাঠ্যক্রম সংস্কারের আগে শিক্ষক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা
- অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো
- স্থানীয় কমিউনিটির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা
প্রবন্ধে আরও বলা হয়, শিক্ষাকে ব্যয় নয়, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিকস, স্মার্ট ক্লাসরুম ও আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার কারণে ব্যয় বাড়লেও তা ভবিষ্যতের জন্য জরুরি বিনিয়োগ।
এছাড়া শিক্ষক নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক প্রভাব বাদ দিয়ে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
সংলাপে অংশ নিয়ে মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুর রব বলেন, “শিক্ষা খাতে এখন অরাজকতা চলছে। বাজেটের আগে জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে গুরুত্বসহকারে ভাবতে হবে।”
জামায়াতের সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ অভিযোগ করেন, শিক্ষার গুণগত উন্নয়নের বদলে সরকার অনেক সময় অবকাঠামো ও বাহ্যিক প্রকল্পে বেশি গুরুত্ব দেয়। তিনি বলেন, “শিক্ষা খাতে প্রকৃত উন্নয়নের বদলে অনেক প্রকল্পে লুটপাটের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।”
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, প্রতিটি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা সবসময় প্রয়োজনীয় নয়। তাঁর মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে মান উন্নয়ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি সিবগাতুল্লাহ বলেন, “ব্রিটিশ আমলের ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থা এখনো জোড়াতালি দিয়ে চালানো হচ্ছে। সময় এসেছে আমূল পরিবর্তনের।”
সভাপতির বক্তব্যে জামায়াতের নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান বলেন, “বাজেটের প্রকৃত পরিবর্তন তখনই আসবে, যখন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা নিশ্চিত হবে।”
সংলাপের সঞ্চালক সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব খ ম কবিরুল ইসলাম বলেন, স্বাধীনতার পর এত বছরেও শিক্ষাব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন হয়নি। তাঁর মতে, টেকসই সংস্কারের জন্য তৃণমূল পর্যায় থেকে কাজ শুরু করতে হবে।