জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের মোকাবিলা যুক্তি, চিন্তা ও রাজনৈতিক সক্ষমতার মাধ্যমে হওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। একই সঙ্গে তারা বলেছেন, গণতান্ত্রিক পরিবেশে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসা অস্বাভাবিক নয়; বরং এটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থারই একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
শনিবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে ‘জুলাই-উত্তর রাজনীতি: গতি ও গত্যন্তর’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব মতামত উঠে আসে। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সেন্টার ফর বেঙ্গল স্টাডিজ।
জুলাইয়ের পর বদলে গেছে রাজনৈতিক বাস্তবতা
আলোচনা সভায় আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপি যে চারটি প্রধান রাজনৈতিক দাবি নিয়ে আন্দোলন করেছে—খালেদা জিয়ার মুক্তি, তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন, নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার এবং নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন—বর্তমানে সেসব দাবির বাস্তবায়ন হয়েছে।
তিনি বলেন, একসময় জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক কার্যক্রমও কঠিন সীমাবদ্ধতার মধ্যে ছিল। দলের কার্যালয় বন্ধ ছিল, অনেক নেতা আত্মগোপনে ছিলেন, কেউ কারাবন্দী ছিলেন, আবার কেউ মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি ছিলেন।
মঞ্জুর ভাষ্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠিত হয়েছে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
‘গালাগালি নয়, যুক্তির রাজনীতি প্রয়োজন’
আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে এবি পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার পথ হওয়া উচিত যুক্তি, চিন্তা ও সাংগঠনিক শক্তির মাধ্যমে। ব্যক্তিগত আক্রমণ বা গালাগালি রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দুর্বল করে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনটি বড় বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—জুলাই-শক্তির মধ্যে মতপার্থক্য, বিজয়ী পক্ষের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার প্রতিযোগিতা এবং পরাজিত রাজনৈতিক শক্তির পুনরায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা।
ইসলামপন্থী দলগুলোর রাজনীতি নিয়ে এনসিপির বক্তব্য
অনুষ্ঠানে জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে মধ্যপন্থার পুনরুত্থান ঘটেছে। একই সঙ্গে ইসলামপন্থী দলগুলোর রাজনৈতিক কার্যক্রমও আবার দৃশ্যমান হয়েছে, যা একটি গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাভাবিক বিষয়।
তার ভাষায়, কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধিতা করা যেতে পারে, তবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তাদের রাজনীতি করার অধিকার অস্বীকার করা উচিত নয়।
তিনি আরও দাবি করেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ঘিরে এখনো নানা বিতর্ক ও ষড়যন্ত্রের চেষ্টা চলছে। এ পরিস্থিতিতে আন্দোলনের চেতনা রক্ষায় সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে।
জুলাই সনদ প্রসঙ্গে সারোয়ার তুষার বলেন, এটি একটি গণতান্ত্রিক দলিল এবং এতে উগ্রপন্থা বা ফ্যাসিবাদী কোনো উপাদান নেই। আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক মানদণ্ডেও এটি গ্রহণযোগ্য বলে তিনি মত দেন।
‘৫ আগস্টের রাতেই আন্দোলনের গতিপথ বদলে যায়’
আলোচনা সভায় হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পরপরই ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মূল চেতনা থেকে সরে গিয়ে ভিন্ন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হয়।
তিনি বলেন, বঙ্গভবনে আমন্ত্রিত প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত হয়ে তিনি এমন একটি পরিস্থিতি দেখেছেন, যেখানে আন্দোলনে অংশ নেওয়া প্রকৃত প্রতিনিধিদের যথাযথ উপস্থিতি ছিল না। তার দাবি, আগে থেকেই একটি নতুন রাজনৈতিক বিন্যাসের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল।
আজিজুল হক আরও অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি শুরুতে তাদের অনেক প্রত্যাশা থাকলেও সময়ের সঙ্গে সেই আশার প্রতিফলন ঘটেনি। তাঁর মতে, জুলাই আন্দোলনের লক্ষ্য ও প্রত্যাশা পূরণে সরকার প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।
আলোচনা সভায় বক্তারা জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।