ঢাকা: গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা হারিয়ে কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা আওয়ামী লীগ আবারও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, আপাতত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তনের বদলে তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠন পুনর্গঠন, অনলাইন যোগাযোগ জোরদার এবং সীমিত পরিসরে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার কৌশল নিয়েছে দলটি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের প্রধান লক্ষ্য সংগঠনের নেটওয়ার্ক সচল রাখা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য রাজনৈতিক সুযোগের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।
তৃণমূল পুনর্গঠনে গুরুত্ব
দলীয় সূত্র জানায়, দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে নতুন কমিটি গঠন কিংবা দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের কাজ চলছে। অনেক জায়গায় পুরোনো কমিটি বিলুপ্ত করে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে, আবার কোথাও সমন্বয়কারী বা দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের মাধ্যমে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
এসব সিদ্ধান্তের বড় অংশই অনলাইনে অনুমোদন বা ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে ঘোষণা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই
ক্ষমতা হারানোর পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে পরিবর্তন কিংবা সাংগঠনিক সংস্কার নিয়ে আলোচনা থাকলেও এখন পর্যন্ত সে ধরনের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
বরং বর্তমান নেতৃত্ব বহাল রেখেই তৃণমূলের সংগঠন সক্রিয় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দলটির নেতাদের মতে, কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় কেন্দ্রীয় সম্মেলন আয়োজন এখন বাস্তবসম্মত নয়। তাই স্থানীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করাই অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
অনলাইন যোগাযোগে বাড়ছে গুরুত্ব
আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থায়ও পরিবর্তন এসেছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি। বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে শীর্ষ নেতৃত্বের যোগাযোগ বাড়ানো হয়েছে।
এতে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত অনেক নেতাও সরাসরি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পাচ্ছেন। তবে এর ফলে প্রচলিত সাংগঠনিক ধাপ কিছু ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ছে বলেও দলের ভেতরে আলোচনা রয়েছে।
নেতৃত্ব বাছাইয়ে যেসব বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে
দলীয় সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে মাঠপর্যায়ে সক্রিয়তা, সাংগঠনিক কাজে অংশগ্রহণ, এলাকায় প্রভাব, অনলাইন প্রচারে ভূমিকা এবং দলীয় কার্যক্রমে ধারাবাহিক সম্পৃক্ততা।
এ ছাড়া সীমিত পরিসরের কর্মসূচি আয়োজন এবং ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে সক্রিয় অংশগ্রহণকেও নেতৃত্ব মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
রাজনৈতিক কৌশলে পরিবর্তনের বদলে সংগঠন সচল রাখার চেষ্টা
পর্যবেক্ষকদের মতে, আওয়ামী লীগের বর্তমান কৌশল মূলত সংগঠনের অস্তিত্ব ধরে রাখা এবং তৃণমূলের কর্মীদের সক্রিয় রাখা। একই সঙ্গে অনলাইন প্রচার ও সাংগঠনিক যোগাযোগের মাধ্যমে সমর্থকদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে দলটি।
তবে এখন পর্যন্ত দলটির পক্ষ থেকে অতীতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রকাশ্য আত্মসমালোচনা বা নীতিগত সংস্কারের কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা সামনে আসেনি।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস বা নতুন কমিটি গঠনের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক দলের জনসমর্থন পুনরুদ্ধার করা সহজ নয়। দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে সাংগঠনিক শক্তির পাশাপাশি নীতিগত অবস্থান, জনআস্থা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তাই আওয়ামী লীগের বর্তমান তৃণমূলভিত্তিক পুনর্গঠন কতটা কার্যকর হবে এবং ভবিষ্যতে দলটির রাজনৈতিক অবস্থান কতটা শক্তিশালী হবে, তা নির্ভর করবে তাদের পরবর্তী কৌশল, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিবেশের ওপর।