বেইজিং: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের কাছে দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সহযোগিতা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন দ্রুততর করার আহ্বান জানিয়েছেন। শুক্রবার বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে তিনি এই আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই তারেক রহমানের প্রথম চীন সফর। এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ একদিকে বেইজিংয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে চায়, অন্যদিকে প্রতিবেশী ভারতসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশলও অনুসরণ করছে।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান বড় বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরেন এবং বাংলাদেশি পণ্যের জন্য চীনা বাজারে আরও বেশি প্রবেশাধিকার দেওয়ার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, শুধু প্রচলিত পণ্যের ওপর নির্ভর না করে রপ্তানি বহুমুখীকরণ জরুরি। এ ক্ষেত্রে আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, মৎস্যপণ্য, কাঁচা চামড়া এবং ওষুধশিল্পের পণ্যের রপ্তানির সম্ভাবনার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন তিনি।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বিদ্যমান শিল্পকারখানার আধুনিকায়নে চীনের আরও সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, এসব উদ্যোগ দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
চীনের শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে দেশটি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয়েছে উইগ তৈরিতে ব্যবহৃত মানবচুল। এছাড়া তুলার সুতা ও পাটজাত পণ্যও উল্লেখযোগ্য রপ্তানি পণ্যের তালিকায় রয়েছে।
বাণিজ্যের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে বাংলাদেশি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি।
চীন বৈঠকে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর (China-Myanmar-Bangladesh Economic Corridor) বাস্তবায়নে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সবুজ ও স্বল্প-কার্বন উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বন্দর উন্নয়ন এবং পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা সম্প্রসারণেরও আগ্রহ দেখিয়েছে বেইজিং।
এ ছাড়া তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও ইতিবাচক অবস্থান জানিয়েছে চীন। দেশটির কর্মকর্তারা প্রকল্পটিকে বাংলাদেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।
এর আগে সফরের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে দুই দেশ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা জোরদারে একাধিক সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করে।
বাংলাদেশ ২০১৬ সালে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এ যোগ দেয় এবং এরপর থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত অংশীদারে পরিণত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের কাছে চীনের ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এছাড়া এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) আরও ২.৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে। অন্যদিকে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে প্রায় ৭.৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে, যার প্রায় অর্ধেকই জ্বালানি খাতে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে চীন বিদেশে অবকাঠামো খাতে অর্থায়নের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক নীতি অনুসরণ করছে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তবে এর মধ্যেও বাংলাদেশ ও চীন বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করে দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারিত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে আগ্রহী।