জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয়েছে জুলাই বিপ্লববিষয়ক দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন (ICJR-2 2026)। এবারের সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ‘জুলাই বিপ্লব ২০২৪-এর লিগ্যাসি: জবাবদিহি, সংস্কার ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ’, যেখানে জুলাই আন্দোলনের উত্তরাধিকার, বিচার, সংস্কার এবং দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও সামাজিক পথরেখা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
রোববার সকাল ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ও জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে দিনব্যাপী এই সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
শহীদ পরিবারের প্রধান দাবি দ্রুত বিচার
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জুলাই বিপ্লবের শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম। তিনি বলেন, শহীদ পরিবারের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো বিচার নিশ্চিত করা। তবে বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতিতে পরিবারগুলো হতাশ হয়ে পড়ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে নানা ধরনের বিলম্ব হচ্ছে। তাঁর মতে, সনদ বাস্তবায়িত না হলে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সংস্কার অসম্পূর্ণ থেকে যাবে এবং ভবিষ্যতে আবারও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ফিরে আসার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতি নিয়ে আশাবাদী সাবেক উপাচার্য
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, সাম্প্রতিক নানা সংকট, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতার মধ্যেও দেশের অর্থনীতি সচল রয়েছে সাধারণ মানুষের অবদানের কারণে।
তিনি বলেন, দেশের ১৮ কোটি মানুষের শ্রম ও অংশগ্রহণই অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছে। তাই সবকিছু ব্যর্থ হয়ে গেছে—এমন প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি ধরে রাখার আহ্বান
ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক উপরাষ্ট্রদূত জন ড্যানিলোভিচ ভিডিও বার্তায় বলেন, জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে এবং কার্যকর বিরোধী দলেরও উদ্ভব হয়েছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের শহীদ, আহত ব্যক্তিদের ত্যাগ এবং তাঁদের পরিবারের কষ্ট কখনো ভুলে যাওয়া উচিত নয়।
‘জুলাই বিপ্লব ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক’
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, জুলাই বিপ্লব দেশের ইতিহাসে অন্যায়, নিপীড়ন ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ গণঅভ্যুত্থান হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি সাদিক কায়েম বলেন, গত ১৬ বছরে দেশ ভয়ভীতি, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। তাঁর মতে, জুলাই আন্দোলন শুধু ৩৬ দিনের একটি আন্দোলন নয়; বরং ন্যায়বিচার, রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং জাতির পুনর্গঠনের দীর্ঘ পথচলার সূচনা।
দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের যৌথ আয়োজন
সম্মেলনটি যৌথভাবে আয়োজন করেছে ঢাকাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আরআইটি, ডাকসু, ইয়ুথ ফর বেটার ফিউচার সোসাইটি, ইউনিভার্সিটি অব রেজিনা (কানাডা), আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম এবং নানিয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি, সিঙ্গাপুরের স্কুল অব সোশ্যাল সায়েন্সেস। মানবাধিকার ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠনও এ আয়োজনে সহযোগিতা করছে।
সম্মেলনে দেশ-বিদেশের গবেষক, শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনের প্রতিনিধিরা জুলাই বিপ্লবের উত্তরাধিকার, জবাবদিহি, রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে মতবিনিময় করছেন।