২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে জাতীয় সংসদে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪১৬ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি হয়েছে চীনের সঙ্গে, আর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারত।
সবচেয়ে বড় বাণিজ্যঘাটতি চীনের সঙ্গে, যার পরিমাণ ১ হাজার ৭৮৬ কোটি ৮০ লাখ ডলার। চীন থেকে বাংলাদেশ আমদানি করেছে ১ হাজার ৮৫৬ কোটি ৩৪ লাখ ডলারের পণ্য, বিপরীতে রপ্তানি করতে পেরেছে মাত্র ৬৯ কোটি ৪৪ লাখ ৯০ হাজার ডলারের পণ্য। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যঘাটতি প্রায় ৭৮৫ কোটি ৯৮ লাখ ৭০ হাজার ডলার। ভারত থেকে আমদানি হয়েছে ৯৬২ কোটি ৪১ লাখ ডলারের পণ্য, আর বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ১৭৬ কোটি ৪২ লাখ ৩০ হাজার ডলারের পণ্য।
সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গেও বাংলাদেশের বাণিজ্যঘাটতি উল্লেখযোগ্য, যার পরিমাণ ৩৫৮ কোটি ৯৪ লাখ ৯০ হাজার ডলার। এছাড়া সিঙ্গাপুর, ব্রাজিল, কাতার ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে যথাক্রমে ২৮০ কোটি ২৫ লাখ, ২৪৫ কোটি ৫ লাখ ৬০ হাজার, ২১০ কোটি ৯৪ লাখ ৮০ হাজার এবং ২১ কোটি ৫ লাখ ৫০ হাজার ডলারের ঘাটতি রয়েছে। সৌদি আরব, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, আর্জেন্টিনা, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান, মরক্কো ও জাপানসহ আরও বহু দেশের সঙ্গেও বাংলাদেশ বাণিজ্যঘাটতির মুখোমুখি।
২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর সম্ভাব্য শুল্ক সুবিধা হারানোর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ও জিএসপি প্লাস সুবিধা অর্জনের ওপর জোর দিচ্ছে। বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এফটিএ আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে ইউরোপীয় কমিশনের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীও ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্টকে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদারে আলোচনা শুরুর অনুরোধ জানিয়েছেন।
তিনি আরও জানান, চীন ইতোমধ্যে তাদের ৯৯ শতাংশ ট্যারিফ লাইনে বাংলাদেশের জন্য শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজারসুবিধা দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে সরকার আশাবাদী।
বাণিজ্যঘাটতি কমাতে সরকার রপ্তানি বহুমুখীকরণের কৌশল গ্রহণ করেছে। বর্তমানে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে, যা অর্থনীতিকে একক খাতনির্ভর করে তুলেছে। এ নির্ভরতা কমাতে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, ওষুধশিল্প, আইসিটি ও সফটওয়্যার সেবা, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, হিমায়িত খাদ্য ও মাছ এবং প্লাস্টিক খাতকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এসব খাতের রপ্তানিকারকদের ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে বন্ড সুবিধা দেওয়ার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রয়োজনীয় আদেশও জারি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাণিজ্যঘাটতি কমাতে শুধু আমদানি নিয়ন্ত্রণ নয়, উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধি এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণই হতে পারে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।