২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ স্বীকার করেছেন তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা। আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি জানান, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সরাসরি হস্তক্ষেপে দিনের ভোট রাতে সম্পন্ন হয়েছিল এবং গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই ও ডিজিএফআইয়ের মাধ্যমে পুরো নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল।
গত মঙ্গলবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দেওয়া এই জবানবন্দিতে তিনি বলেন, প্রশাসন ও পুলিশের কিছু অসৎ কর্মকর্তার যোগসাজশে নির্বাচনকার্যক্রমে অনিয়ম ঘটে। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসাহী ভূমিকা এবং পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় এই অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।
নূরুল হুদা জানান, নির্বাচনের ফলাফলে অনেক কেন্দ্রে ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ ভোট পড়া অস্বাভাবিক ছিল। তিনি আরও জানান, ভোটের আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তি করা হয়েছিল। তবে তিনি দাবি করেন, এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন অন্ধকারে ছিল এবং কমিশনের কেউই বিষয়টি জানতেন না।
তিনি বলেন, গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই ও ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পুরো নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল। বিশেষ করে কিছু পুলিশ কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তারাও অনিয়মে জড়িত ছিলেন। বিএনপির অভিযোগ অনুযায়ী, ওই নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব দেখা যায়।
নূরুল হুদা আরও বলেন, তাঁর ভাগনে এস এম শাহজাদা আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় তাঁর কোনো ভূমিকা ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি।
জবানবন্দিতে তিনি জানান, নির্বাচন কমিশন নির্বাচন বাতিল করতে পারেনি কারণ গেজেট প্রকাশের পর সে ক্ষমতা থাকে না। তিনি বলেন, সরকারের সদিচ্ছা না থাকলে কোনো নির্বাচন নিরপেক্ষ হয় না এবং অতি উৎসাহী কিছু কর্মকর্তা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন।
উল্লেখ্য, দিনের ভোট রাতে করার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে আছেন নূরুল হুদা। একই মামলায় গ্রেপ্তার আছেন সাবেক সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়ালও।
এই নির্বাচনের বিতর্কিত ভূমিকায় পুলিশের অনেক সদস্যও জড়িত ছিলেন বলে জানান নূরুল হুদা। তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশের অনেকেই বিএনপি নেতা-কর্মীদের গণহারে গ্রেপ্তার করেন এবং নির্বাচনী অনিয়মে জড়িত থাকেন।
তিনি বলেন, নির্বাচন শতভাগ নিরপেক্ষ করতে হলে সরকারের সদিচ্ছা থাকতে হবে। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব না কমালে এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত না করলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।
এই বিতর্কিত নির্বাচনের বিষয়ে তদন্ত করতে অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, যা শিগগিরই কাজ শুরু করবে।
শেষাংশে সংশোধনীতে বলা হয়, এনএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক টি এম জুবায়েরের বিরুদ্ধেই কেবল জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অনুসন্ধান করছে দুদক, যা আগে ভুলভাবে উল্লিখিত হয়েছিল।