সোমবার ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ছোট পরিসরের মন্ত্রিসভা, গুরুত্ব পাবেন প্রবীণ-নবীন সমন্বয় 

ফেব্রুয়ারি 16, 2026
ছোট পরিসরের মন্ত্রিসভা, গুরুত্ব পাবেন প্রবীণ-নবীন সমন্বয় 

নতুন মন্ত্রিসভা সম্ভবত ৩৫ থেকে ৩৭ সদস্যের হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ২৬-২৭ জনকে পূর্ণ মন্ত্রী এবং ৯-১০ জনকে প্রতিমন্ত্রী করা হতে পারে। 

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান আগামীকাল মঙ্গলবার দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন। একইসঙ্গে মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যরাও শপথ নেবেন। বিএনপির নতুন মন্ত্রিসভায় কারা স্থান পাবেন, তা নিয়ে সাধারণ জনগণসহ সবার মধ্যে তীব্র কৌতূহল দেখা যাচ্ছে। 

ফেসবুকসহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন মন্ত্রিসভার সম্ভাব্য সদস্যদের নানা তালিকা ছড়িয়ে পড়ছে। তবে বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র প্রথম আলোকে জানিয়েছে যে, এসব তালিকার কোনোটিই সম্পূর্ণ সত্য নয়। 

দলের গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলো জানাচ্ছে, নতুন মন্ত্রিসভার আকার ৩৫ থেকে ৩৭ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। এর মধ্যে ২৬-২৭ জন পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হতে পারেন, আর প্রতিমন্ত্রী হিসেবে ৯ থেকে ১০ জনকে নেওয়া হতে পারে। শেষ মুহূর্তে আরও এক-দুজন যোগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে ২০০১ সালে বিএনপির মন্ত্রিসভা ছিল ৬০ সদস্যের, যা তখন রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এবার মন্ত্রিসভাকে ছোট রাখার চেষ্টা করছেন। 

দলের গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলো আরও বলছে যে, তারেক রহমান এবার প্রবীণ-নবীন, অভিজ্ঞ এবং দক্ষ নেতাদের সমন্বয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করতে চান। কারা মন্ত্রিসভায় স্থান পাবেন, তা মূলত তিনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যদিও দলের স্থায়ী কমিটির একজন নেতা এতে যুক্ত রয়েছেন। তবে গত শনিবার এবং রোববার রাতে তারেক রহমান দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ বিষয়ে কেউ প্রকাশ্যে নাম উল্লেখ করে মন্তব্য করতে চাননি। 

প্রবীণ-নবীন, অভিজ্ঞ ও দক্ষ নেতাদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে বিএনপিতে আলোচনা চলছে। 

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদ নেতা হবেন। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং সালাহউদ্দিন আহমদকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ওসমান ফারুকের নামও বিবেচনায় আছে। এছাড়া বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা, জোটভুক্ত দলের নেতা, তরুণ নেতা, জেলা পর্যায়ের নেতা এবং বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের মন্ত্রিসভায় যুক্ত করার কথাও আলোচনায় রয়েছে। 

কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়ে অতীতে প্রশ্ন ও বিতর্ক উঠেছিল। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, নির্বাচনী ইশতেহারে তারেক রহমান যেসব সুশাসন এবং নাগরিক সেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য সৎ, দক্ষ এবং যোগ্য ব্যক্তিদের মন্ত্রিসভায় আনা দরকার। তাঁরা উল্লেখ করছেন যে, ২০০১-০৬ সালের বিএনপি সরকারে বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ, নৌপরিবহন, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগসহ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। এসব মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হয়নি। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা ছাড়াই সঞ্চালন লাইন স্থাপন করা হয়েছিল, যা তখন ‘খাম্বা’ নামে ব্যাপক সমালোচিত হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক দামবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও সমালোচিত হয়েছিল। 

২০০১-০৬ সালের সরকারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়েও নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক ছিল। 

সন্ত্রাস নির্মূলের নামে ২০০৪ সালে র‌্যাব গঠন করা হয়, কিন্তু র‌্যাবের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছিল। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট ৬৩ জেলায় বোমা হামলায় গোয়েন্দা ব্যর্থতাসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এছাড়া ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান এবং ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায়ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়ে জোরালো সমালোচনা হয়। 

একইভাবে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। রাজধানীতে প্লট বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ উঠে, যা ‘বিএনপিপল্লি’ নামে পরিচিত হয়। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে এক দাতা দেশ অর্থায়ন প্রত্যাহার করে। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সিএনজিচালিত অটোরিকশার নিবন্ধনে অনিয়মের অভিযোগ উঠে। 

রাজনীতিতে ইতিবাচক ধারার শুরু 

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ১৯ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে আসা বিএনপির নতুন মন্ত্রিসভা কেমন হবে, তা নিয়ে সবার নজর রয়েছে। কারণ, তারেক রহমান ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। 

দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয়ের পর তিনি জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর দেন। নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসার রাজনীতি কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না বলে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। 

দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য বিভাজন দূর করে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার উদ্যোগকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। 

শনিবারের সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সরকার ও বিরোধী দলের দায়িত্বশীল ভূমিকার কথা বলেন। রাজনৈতিক দলগুলোকে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশ গঠনে আপনাদের চিন্তাভাবনাও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের পথ ও মত ভিন্ন থাকতে পারে, কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক। আমি বিশ্বাস করি, জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা।’ 

এই বক্তব্যের পরদিন গতকাল জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় সৌজন্য সাক্ষাতে যান তারেক রহমান। সরকার গঠনের আগে এই উদ্যোগকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা রাজনীতিতে ইতিবাচক ধারার সূচনা হিসেবে দেখছেন। দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য বিভাজন দূর করে জাতীয় ঐক্য গড়ার উদ্যোগকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। 

নতুন সরকারের প্রথম দিকেই অর্থনৈতিক ‘সিগন্যালিং’ (সংকেত দেওয়া) দেওয়াটা খুব জরুরি। মন্ত্রিসভা এবং রাষ্ট্র যাঁরা চালাবেন, তাঁদের বাস্তবভিত্তিক দক্ষতার বিষয়টাও গুরুত্বপূর্ণ ‘সিগন্যালিং’ হবে। 

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান 

যোগ্য মানুষদের রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন 

নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল, অন্য মত কিংবা ভিন্নমত—প্রত্যেক নাগরিকের জন্যই আইন সমান। 

এসব কাজের জন্য মন্ত্রিসভায় সৎ, দক্ষ, কর্মঠ এবং দূরদর্শী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। 

সরকার গঠনের পর বিএনপির মূল চ্যালেঞ্জ কী হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, দেশের অর্থনীতিকে সঠিক পথে আনতে হবে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। বিগত সরকার প্রায় সব প্রতিষ্ঠানকে রাজনীতিকরণ করেছে, তাই সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। 

এসব কাজের জন্য মন্ত্রিসভায় সৎ, দক্ষ, কর্মঠ ও দূরদর্শী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। 

তাঁরা বলছেন, নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি বলেছে, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক ও পুনর্বাসনমূলক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠন করা হবে। এমন কার্যক্রম পরিচালনায় নতুন সরকারে যোগ্য মানুষদের রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন। 

এবার নির্বাচনী প্রচারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে বারবার কথা বলেছে বিএনপি। ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিএনপির এই প্রতিশ্রুতিতে জনগণের আস্থা ভোটের ফলাফলে স্পষ্ট। তাই সরকার ও প্রশাসনে সৎ ও দক্ষ মানুষদের এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। 

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, তারেক রহমান রাষ্ট্র পরিচালনায় যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেগুলোর বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে, তা মন্ত্রিসভা দেখে অনেকটাই বোঝা যাবে। 

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান প্রথম আলোয় লিখেছেন যে, নতুন সরকারের প্রথম দিকেই অর্থনৈতিক সংকেত দেওয়া খুব জরুরি। মন্ত্রিসভা এবং রাষ্ট্র পরিচালকদের বাস্তবভিত্তিক দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হবে। 

নতুন মন্ত্রিসভায় দক্ষ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা আরও কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও মতামতে উল্লেখ করেছেন। 

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on print

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আরও পড়ুন