ঢাকা: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছেন, জাতীয় অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে যেকোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারাজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে সরকার। একই সঙ্গে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ, পানি ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি।
সোমবার জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সমাপনী আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সংসদের ভেতরে ও বাইরে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য বিরোধী দলের প্রতিও আহ্বান জানান।
তিস্তা ও পদ্মা প্রকল্পে সরকারের অগ্রাধিকার
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিস্তা ব্যারাজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। পাশাপাশি পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে বর্ষাকালের অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে কৃষি ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা যায়।
সরকার দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন ও জলসম্পদ ব্যবহারে নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়েছে বলেও জানান তিনি।
‘জীবনবান্ধব’ বাজেটের দাবি
প্রস্তাবিত বাজেটকে “জীবনবান্ধব বাজেট” হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি আনাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। তিনি দাবি করেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬১টি পণ্যের ওপর কর প্রত্যাহারের ফলে বাজেট ঘোষণার আগে ও পরে বাজারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হয়নি।
সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জ্বালানি ও সামাজিক সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে বলেও তিনি জানান।
বাজেটের তিন প্রধান লক্ষ্য
প্রধানমন্ত্রী জানান, এবারের বাজেট তিনটি মূল লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রণয়ন করা হয়েছে—
- দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা।
- অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।
- বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা।
তিনি বলেন, অর্থনীতিকে সীমিত গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।
তিন ধাপে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা
সরকার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে তিন ধাপের কৌশল গ্রহণ করেছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
প্রথম ধাপে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
দ্বিতীয় ধাপে রাজস্ব সংস্কার, ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তৃতীয় ধাপে উদ্ভাবননির্ভর, প্রতিযোগিতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী করা হবে।
তরুণদের কর্মসংস্থান ও সৃজনশীল অর্থনীতিতে জোর
তারেক রহমান বলেন, সরকার এমন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায় যেখানে তরুণরা শুধু চাকরির অপেক্ষায় না থেকে নিজেরাই উদ্যোক্তা হতে পারবেন।
তিনি চলচ্চিত্র, নাটক, সংগীত ও খেলাধুলাকে “ক্রিয়েটিভ ইকোনমি” হিসেবে উল্লেখ করে এই খাতগুলোকে জাতীয় অর্থনীতির মূল ধারায় যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও জানান।
পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে উদ্যোগ
বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া জোরদার করেছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তার তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে ১৩টি দেশের সঙ্গে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স অনুরোধ পাঠানো হয়েছে এবং সম্পদ পুনরুদ্ধারে ৬০টির বেশি গোপনীয়তা চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে।
জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাতে সংস্কার
প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, অতীতে জ্বালানি খাতে দুর্নীতি, ভুল পরিকল্পনা এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে বড় ক্ষতি হয়েছে।
তিনি জানান, বর্তমান সরকার দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ, জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
প্রতিরক্ষা খাতে আধুনিকায়ন, প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করাও সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে।
বিরোধী দলের প্রতি সহযোগিতার আহ্বান
সংসদে বক্তব্যের শেষদিকে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় স্বার্থে রাজনৈতিক ঐক্যের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জুলাই সনদ, সংবিধান সংস্কার এবং অন্যান্য জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংসদের ভেতরে ও বাইরে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে দেশ আরও এগিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, সরকারের মূল নীতি “সবার আগে বাংলাদেশ” এবং “সবার জন্য বাংলাদেশ”। জনগণের সম্পদ রক্ষা, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মাধ্যমে নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।